লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী দেশ ব্রাজিলের নির্বাচন ঘিরে বিশ্বজুড়ে যখন নানা ধরনের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বিস্ফোরক মন্তব্য বৈশ্বিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করেছে।
ব্রাজিলের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো ভাষায় ‘কারচুপিপূর্ণ’ এবং সম্পূর্ণরূপে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে প্রকাশ্যেই গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধানের এমন প্রত্যক্ষ সমালোচনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে এখন অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বর্তমানে এক ধরনের নির্বাচনী আবহ বিরাজ করছে। মার্কিন পার্লামেন্টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটিতে রাজনৈতিক তৎপরতা এখন তুঙ্গে।
এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই গত ছাব্বিশে অক্টোবর সোমবার মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের করিন্থ শহরে রিপাবলিকান পার্টির এক বিশাল নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সেই সমাবেশে যাওয়ার পথেই অপেক্ষমাণ সংবাদকর্মীদের সঙ্গে এক অনির্ধারিত ও অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়ে অংশ নেন তিনি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে সদা তৎপর সাংবাদিকরা স্বভাবতই সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ঘটনা অর্থাৎ ব্রাজিলের সদ্য শেষ হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটি তার কাছে সার্বিকভাবে ‘সুষ্ঠু’, অবাধ ও নিরপেক্ষ বলে মনে হয়েছে কি না, সে বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুস্পষ্ট মতামত জানতে চান।
সাংবাদিকদের এমন প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অত্যন্ত অকপটে নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই সরাসরি বলেন যে, এই নির্বাচনের সার্বিক চিত্র তার কাছে অত্যন্ত বাজে এবং হতাশাজনক বলে মনে হয়েছে।
তার ভাষায়, ব্রাজিলের এই সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং এর পারিপার্শ্বিক পুরো বিষয়টিই ছিল এককথায় ভয়াবহ ও অগ্রহণযোগ্য। বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ ধরনের নির্বাচন কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তিনি এই নির্বাচনে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষ অবলম্বন করেননি।
তবে একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে তার ব্যক্তিগত ও স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি নির্দ্বিধায় বলেন, সত্য কথা বলতে গেলে, এই নির্বাচনটিকে তার কাছে অন্য আরও দশটি সাধারণ কারচুপিপূর্ণ ও প্রহসনের নির্বাচনের মতোই মনে হয়েছে, যেখানে জনগণের প্রকৃত রায়ের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি।
ব্রাজিলের এই ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে সারা বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তীক্ষ্ণ নজর ছিল। গত রোববার দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপ বা রান-অফ অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
এই চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক নির্বাচনে ব্রাজিলের প্রবীণ ও বামপন্থী রাজনীতিক লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা মোট একান্ন দশমিক সাত নয় শতাংশ বৈধ ভোট পেয়ে এক অবিস্মরণীয় ও নাটকীয় জয় নিশ্চিত করেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিনি সারা দেশ থেকে সব মিলিয়ে ছয় কোটি চল্লিশ লাখেরও বেশি ভোটারের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভে সক্ষম হন। অন্যদিকে, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং দেশের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের অন্যতম মুখ সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে মোট আটচল্লিশ দশমিক দুই এক শতাংশ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।
অত্যন্ত সামান্য ব্যবধানের এই জয়-পরাজয় প্রমাণ করে যে, ব্রাজিলের সমাজ ও রাজনীতি কতটা গভীরভাবে মেরুকৃত। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে চতুর্থবারের মতো (যদিও এই মেয়াদগুলো টানা বা নিরবচ্ছিন্ন নয়) রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।
নির্বাচনী ব্যবস্থার পবিত্রতা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত জোরালো দাবি উত্থাপন করেন যে, যেকোনো দেশের জাতীয় নির্বাচন সব সময় সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। একটি রাষ্ট্রের নির্বাচন প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন যেন এর স্বচ্ছতা নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো মহলেই বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ না থাকে।
তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ব্রাজিলের এই সদ্য-সমাপ্ত নির্বাচনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অত্যন্ত নেতিবাচক, দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে।
সাংবাদিকদের সামনে নিজের অবস্থান আরও একবার পরিষ্কার করে তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে, একটি আদর্শ নির্বাচন হতে হবে সম্পূর্ণ প্রশ্নাতীত এবং স্বচ্ছতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ব্রাজিলের ক্ষেত্রে তার কাছে পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত খারাপ, সন্দেহজনক এবং ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
নির্বাচন পরিচালনার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি নিয়ে ধারাবাহিক সমালোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও সাংবাদিকদের সামনে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
তিনি আবারও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, এই সমগ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তিনি ব্রাজিলের কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে বিন্দুমাত্র সমর্থন করেননি বা ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে কারও পক্ষও নেননি।
তিনি মূলত একজন দূরবর্তী কিন্তু মনোযোগী পর্যবেক্ষক হিসেবে সম্পূর্ণ নির্বাচনটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আর সেই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই তার কাছে ব্রাজিলের এই নির্বাচন ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত, অস্বচ্ছ এবং ভয়াবহ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে, যা একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই শোভনীয় নয়।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্কের যে একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে সেটিও অত্যন্ত চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। ব্রাজিলের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন বলে ট্রাম্প অকপটে উল্লেখ করেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, তিনি কোনোভাবেই ব্রাজিল পরিচালনা করছেন না বা তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টও নন; তার প্রধান ও একমাত্র পরিচয় হলো তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
তিনি তার সীমাবদ্ধতা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। নবনির্বাচিত নেতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে তিনি বলেন, লুলাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বেশ পছন্দ করেন এবং তার সঙ্গে পূর্বাপর সম্পর্কও বেশ ভালো ও সৌহার্দ্যপূর্ণ।
তবে ব্যক্তিগত এই সুসম্পর্কের কথা স্বীকার করার পাশাপাশি তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার বিষয়টি পুনরায় সামনে নিয়ে আসেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে পদ্ধতিতে এবং যে প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে, তা একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে তার কাছে খুবই অদ্ভুত, অস্বাভাবিক এবং রহস্যজনক বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থা এএফপি (এজেন্সি ফ্রান্স-প্রেস) এবং তুরস্ক ভিত্তিক স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই চাঞ্চল্যকর ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যের খবরটি বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারিত হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মন্তব্য কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমগ্র লাতিন আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর প্রকাশ্য মতামতের প্রভাব নিয়ে আগামী দিনগুলোতে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।