মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী এবং সাবেক ডেট্রয়েট স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল-সাইয়েদকে লক্ষ্য করে ট্রাম্প যে তীব্র মুসলিমবিদ্বেষী ও উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন, তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলেও সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
রবিবার অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এল-সাইয়েদকে একজন ‘জিহাদি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এই মুসলিম প্রার্থীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি হিসেবেও তুলে ধরেছেন।
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে একজন মূলধারার রাজনৈতিক প্রার্থীর দেশপ্রেম ও আনুগত্য নিয়ে এমন প্রকাশ্য প্রশ্ন তোলার বিষয়টি মার্কিন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর আলোচনা শুরু হয়েছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ভাষণে আবদুল এল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীনভাবে ‘সন্ত্রাসীদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া’র গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।
ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক বাগাড়ম্বর কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তিনি এল-সাইয়েদের ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। সমাবেশে উপস্থিত হাজারো সমর্থকের সামনে ট্রাম্প অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন যে, আবদুল এল-সাইয়েদ যদি কোনোভাবে নির্বাচনে জয়লাভ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা বা সিনেটে প্রবেশের সুযোগ পান, তবে তার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা তল্লাশির ব্যবস্থা করতে হবে।
এমনকি সিনেট ভবনে প্রবেশের আগে তাকে মেটাল ডিটেক্টর বা ধাতব পদার্থ শনাক্তকারী যন্ত্রের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করতে বাধ্য করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একজন উচ্চশিক্ষিত ও জনপ্রিয় প্রার্থীর প্রতি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন মন্তব্যকে অনেকেই চরম অবমাননাকর এবং বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
ট্রাম্পের এই বিতর্কিত ভাষণের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং সমালোচিত অংশটি ছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (৯/১১) মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ টেনে আনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই ট্র্যাজেডিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প মূলত ভোটারদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করেছেন বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
ভাষণে তিনি ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ৯৩ নম্বর ফ্লাইটের যাত্রীদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের ঘটনার সঙ্গে সিনেট কক্ষে এল-সাইয়েদের প্রবেশ ঠেকানোর বিষয়টির এক অকল্পনীয় তুলনা করেন। উল্লেখ্য, ৯/১১-এর সেই অভিশপ্ত দিনে ৯৩ নম্বর ফ্লাইটের সাধারণ যাত্রীরা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে বিমান ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, যার ফলে বিমানটি ওয়াশিংটন ডিসির কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভবনে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়।
ট্রাম্প তার সমর্থকদের উদ্দেশে সেই যাত্রীদের মতো সাহসিকতা নিয়ে এল-সাইয়েদকে প্রতিহত করার আহ্বান জানান। একজন বৈধ রাজনৈতিক প্রার্থীর গণতান্ত্রিক যাত্রাকে ঠেকাতে এমন একটি জাতীয় শোকের ঘটনাকে ব্যবহার করা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করা হচ্ছে।
যদি এবারের নির্বাচনে আবদুল এল-সাইয়েদ জয়লাভ করতে সক্ষম হন, তবে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার এক অনন্য গৌরব অর্জন করবেন। ডেট্রয়েট শহরের মতো একটি জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সাবেক শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে জনস্বাস্থ্যে তার অসামান্য অবদান রয়েছে।
ট্রাম্পের এই ভিত্তিহীন ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যের জবাবে এল-সাইয়েদ অত্যন্ত সংযত অথচ দৃঢ় ভাষায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি তার বিরুদ্ধে আনা উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার যাবতীয় অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার গভীর আনুগত্য, দেশপ্রেম এবং নিষ্ঠার বিষয়ে প্রশ্ন তোলার এই হীন প্রচেষ্টাকে তিনি ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। এল-সাইয়েদ তার সমর্থকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, বিভাজনের এই রাজনীতি তাকে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না এবং তিনি মার্কিন নাগরিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বিতর্কিত মন্তব্য কেবল তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরই ক্ষোভের কারণ হয়নি, বরং তার নিজের দলের অভ্যন্তরে এবং মিত্রদের মধ্যেও গভীর অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, আরব-আমেরিকান সম্প্রদায়ের যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তি অতীতে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন, তারাও এখন এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আরব-আমেরিকান ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা ও সমর্থন বাড়ানোর প্রচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী সংগঠন ‘আরব আমেরিকানস ফর ট্রাম্প’ গোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিশারা বাহবাহ প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন।
তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য রাজনৈতিক প্রচারণার সব সীমা অতিক্রম করে গেছে। সংবাদমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বাহবাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, প্রেসিডেন্টের এই ধরনের বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি এটিকে সরাসরি বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে বলেন, এই মন্তব্যগুলো একটি স্পর্শকাতর সীমারেখা অতিক্রম করেছে যা আরব-আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা তৈরি করবে।
মিশিগানের এই নির্বাচনি সমাবেশটি মূলত আয়োজন করা হয়েছিল রিপাবলিকান দলের সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের প্রতি সমর্থন জানানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু ট্রাম্পের ভাষণ রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক এবং ব্যক্তিগত বিষয়ের দিকে মোড় নেয়।
এল-সাইয়েদকে নিয়ে তীব্র বাক্যবাণ নিক্ষেপ করার পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনপ্রিয় র্যাপ সংগীতশিল্পী নিকি মিনাজের শারীরিক গঠন নিয়েও সমাবেশে মন্তব্য করেন, যা অনেককেই অবাক করেছে।
তিনি মিনাজের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করতে উপস্থিত জনতাকে উৎসাহিত করেন, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চের গাম্ভীর্যকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। রাজনৈতিক সমাবেশে এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য অবশ্য ট্রাম্পের জন্য নতুন কিছু নয়।
এর আগে চলতি অক্টোবর মাসেই ওহাইও অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডের শারীরিক গঠন নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছিলেন। সাবেক এই কলেজ ফুটবল খেলোয়াড়ের শরীর ও হাতের গঠন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই তার শারীরিক সক্ষমতা ও ক্রীড়াশৈলীর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
মিশিগানের এই সমাবেশে দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামগ্রিক বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনীতিতে বেশ কয়েকটি উদ্বেগজনক বিষয়কে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানো, বর্ণবাদের উসকানি দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আক্রমণাত্মক ও অবমাননাকর ভাষার ব্যবহার দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
বিশেষ করে, সাংবিধানিক অধিকার থাকা সত্ত্বেও একজন মুসলিম প্রার্থীর জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশপ্রেম নিয়ে প্রকাশ্য মঞ্চে প্রশ্ন তোলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, মার্কিন রাজনীতিতে বিভাজনের রেখা কতটা গভীর হচ্ছে।
এই ঘটনার ফলে ট্রাম্পের সাবেক আরব-আমেরিকান সমর্থকদের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তা আসন্ন নির্বাচনে মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে রিপাবলিকান শিবিরের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক আদর্শের লড়াই যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণায় রূপ নেয়, তখন তা একটি দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবেই বিবেচিত হয়।