এই ঘটনা ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশদ প্রতিবেদনে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে তার পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার এবং শেষ পর্যন্ত তার যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়ার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, যা মূলত দেশটির বিচারব্যবস্থা ও সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঘটনার আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার, ২৬ অক্টোবর। ওই দিন ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আইনি প্রতিষ্ঠান বা সুপ্রিম ফেডারেল কোর্ট চলমান একটি হাই-প্রোফাইল অর্থপাচার বা মানি লন্ডারিং তদন্তের অংশ হিসেবে ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারোকে অত্যন্ত কড়া নির্দেশ প্রদান করে।
আদালতের সেই নির্দেশে বলা হয়েছিল যে, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে তার কাছে থাকা সকল বৈধ পাসপোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিতে হবে। দেশের বিচার বিভাগের এই নির্দেশকে ফ্লাভিও বলসোনারো সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেন এবং নির্ধারিত আইনি সময়সীমার মধ্যে তিনি কোনো পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেননি।
আদালতের আদেশের প্রতি এই চরম অবজ্ঞার পর মঙ্গলবার ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রীয় আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে তার সকল ব্রাজিলীয় পাসপোর্ট সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করে।
পাসপোর্ট বাতিলের এই রাষ্ট্রীয় ঘোষণার পরপরই ফ্লাভিও বলসোনারোর অবস্থান নিয়ে এক বিশাল ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। তবে বিবিসি ব্রাজিল ও বিবিসি মুন্ডোর অত্যন্ত বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আইনি জটিলতা এড়াতে ফ্লাভিও বলসোনারো ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করছেন এবং সেখানে তিনি তার ছোট ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে সবচেয়ে বড় রহস্যের বিষয় হলো, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়ে এবং নিজের বৈধ পাসপোর্ট বাতিল হয়ে যাওয়ার পরও ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বা কোন পথ ব্যবহার করে তিনি ব্রাজিল থেকে সফলভাবে আন্তর্জাতিক সীমানা পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম হলেন, তা এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিয়ে দুই ভাইয়ের কারও কাছ থেকেই সংবাদমাধ্যমগুলো কোনো ধরনের সরাসরি বা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য আদায় করতে সক্ষম হয়নি, যা পুরো ঘটনাটিকে আরও বেশি রহস্যময় করে তুলেছে।
ফ্লাভিওর এই রহস্যজনক যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশ পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মহলে এক ধরনের প্রস্তুতির আভাস পাওয়া গিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আগেই জানিয়েছিলেন যে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ফ্লাভিও বলসোনারো এবং তার পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষ ভিসার অনুমোদন দেবে এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আইনি অনুমতি প্রদান করবে।
পাসপোর্ট বাতিল হওয়ার পরও একজন পরাজিত ও আইনিভাবে অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রদানের এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তির জন্ম দিতে পারে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন।
এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ইতিমধ্যেই হোয়াইট হাউস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে অবস্থিত উভয় দেশের দূতাবাসগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া চেয়ে পাঠিয়েছে।
ফ্লাভিও বলসোনারোর এই হঠাৎ দেশত্যাগের বিষয়টি তার নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কারণ, ঠিক এক দিন আগেই, অর্থাৎ সোমবার পাসপোর্ট জমা দেওয়ার আদালতের নির্দেশের পরপরই ফ্লাভিও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জনসমক্ষে ঘোষণা করেছিলেন যে, এই মুহূর্তে দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কোনো ধরনের পরিকল্পনা তার নেই।
শুধু তা-ই নয়, তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে, তিনি ব্রাজিলেই অবস্থান করবেন এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সদ্য জয়ী হওয়া বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নতুন সরকারের বিরুদ্ধে দেশের বিরোধী রাজনীতিতে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন।
কিন্তু তার এই রাজনৈতিক ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট জমা না দেওয়া এবং আচমকা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়ার পর তার প্রকৃত অবস্থান নিয়ে দেশজুড়ে চরম অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
এমনকি তার নিজস্ব আইনি দলের সদস্যরাও এই বিষয়ে পুরোপুরি অন্ধকারে ছিলেন। তার আইনজীবীরা বিবিসি ব্রাজিলকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, তাদের মক্কেল বর্তমানে ঠিক কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে তাদের কাছে বিন্দুমাত্র কোনো তথ্য নেই।
ফ্লাভিও বলসোনারো দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে ব্রাজিলের প্রশাসন ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল তিনি হয়তো সীমান্ত পেরিয়ে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করে থাকতে পারেন।
এই সন্দেহের ভিত্তিতে ব্রাজিলের ফেডারেল কর্মকর্তারা দুই দেশের সীমান্ত পারাপারের বিভিন্ন স্থানে এবং চেকপোস্টগুলোতে গভীরভাবে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। তবে এই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনার সীমান্ত ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে যে, তাদের দেশের কোনো বৈধ বা আনুষ্ঠানিক সীমান্ত ব্যবহার করে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রবেশের কোনো রেকর্ড তাদের ডেটাবেসে নেই।
এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি অন্য কোনো গোপন বা বিকল্প মাধ্যমে সরাসরি ফ্লোরিডার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে বর্তমানে ব্রাজিলের বিভিন্ন আইনি সংস্থায় একাধিক অত্যন্ত গুরুতর ও জটিল অপরাধের তদন্ত চলমান রয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত একটি অভিযোগ হলো তার বাবা এবং ব্রাজিলের সাবেক ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে নিয়ে নির্মিত ‘ডার্ক হর্স’ নামক একটি তথ্যচিত্র বা চলচ্চিত্রের অর্থায়ন সংক্রান্ত বিতর্ক। অভিযোগ রয়েছে যে, এই চলচ্চিত্রের পেছনে অবৈধ অর্থের লেনদেন হয়েছিল।
এছাড়াও, ব্রাজিলের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিতর্কিত আইনজীবীর সঙ্গে তার কথিত ব্যবসায়িক ও অবৈধ সম্পর্ক নিয়েও একটি পৃথক ও গভীর তদন্ত চলছে। ওই নির্দিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ১০০ কোটি বা এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ব্রাজিলের পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে ওই অভিযুক্ত আইনজীবীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের গোপন ব্যাংক হিসাবগুলো ব্যবহারের অবাধ সুযোগ ছিল। যদিও ফ্লাভিও নিজে ওই আইনজীবীর সঙ্গে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক বা অবৈধ সম্পর্কের কথা বারবার এবং কঠোরভাবে অস্বীকার করে এসেছেন।
এর বাইরেও, তার বিরুদ্ধে আরও একটি বড় অভিযোগ হলো সদ্য সমাপ্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় অবৈধ বিদেশি অর্থায়নের ব্যবহার। এই কথিত বিদেশি অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারণার যাবতীয় হিসাব-নিকাশ নিয়েও সুপ্রিম কোর্ট নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারো মূলত সদ্য অনুষ্ঠিত রোববারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় বা রানঅফে প্রবীণ বামপন্থী নেতা লুলার কাছে এক তীব্র ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরাজিত হন।
ব্রাজিলের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী লুলা দা সিলভা পেয়েছিলেন মোট প্রদত্ত ভোটের ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট, আর অন্যদিকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছিলেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট।
প্রায় ৪৪ লাখ ভোটের এক বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও ফ্লাভিও শুরু থেকেই এই নির্বাচনের ফলাফলকে মেনে নিতে চরম অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। নির্বাচনের পর পরই তিনি গণতান্ত্রিক রায়কে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনের সম্পূর্ণ ফল বাতিলের তীব্র দাবি জানিয়েছিলেন।
তার প্রধান অভিযোগ ছিল যে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময় দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে ভোটের ফলাফলে কারচুপি হয়েছে এবং এর ফলে তিনি রাজনৈতিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তবে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ভোটের সময় বাড়ানোর এই বিশেষ অনুরোধটি এককভাবে কোনো দলের পক্ষ থেকে আসেনি, বরং ফ্লাভিওর নিজের রাজনৈতিক দল এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী দল উভয়ের পক্ষ থেকেই এই অনুরোধ করা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে ফ্লাভিও বলসোনারোর এই আকস্মিক দেশত্যাগ, আইনি ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রাপ্তির বিষয়টি ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক নতুন এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম দিয়েছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আগামী দিনগুলোতেও দেশটির রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থায় দৃশ্যমান হবে।