বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ১২৪ কোটি টাকার মামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ১২৪ কোটি টাকার মামলা
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন চরম উত্তেজনা ও টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সম্পূর্ণ নতুন এক আইনি ও নৈতিক জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

নির্বাচনী প্রচারণায় বিনা অনুমতিতে গান ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ১০ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৪ কোটি টাকার একটি বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

প্রখ্যাত কানাডীয়-মার্কিন সংগীতশিল্পী এবং রক আইকন নিল ইয়ং তার বিখ্যাত ও তুমুল জনপ্রিয় প্রতিবাদী গান ‘রকিন ইন দ্য ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ সম্পূর্ণ অননুমোদিতভাবে বাজানোর কারণে এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

 

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত এক অত্যন্ত বিশদ প্রতিবেদনে এই তথ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণার নীতি, রাজনৈতিক নৈতিকতা এবং শিল্পীর মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করছে।

 

আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন এবং মার্কিন আদালতের দায়ের করা মামলার আনুষ্ঠানিক নথিপত্র অনুযায়ী, এই বিতর্কিত ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটে গত ১২ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত ওহাইওতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশাল ও জনবহুল নির্বাচনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, যেখানে তার হাজার হাজার সমর্থক উপস্থিত ছিলেন।

 

সেই জমকালো ও উন্মাদনাময় সমাবেশেই সমর্থকদের উজ্জীবিত করার কৌশল হিসেবে নিল ইয়ংয়ের এই কালজয়ী গানটি উচ্চস্বরে বাজানো হয়। এই ঘটনায় চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে বর্ষীয়ান সংগীতশিল্পী নিল ইয়ং সরাসরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার ওই নির্বাচনী সমাবেশ আয়োজনের মূল দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক সংগঠন ‘ট্রাম্প ৪৭’ কমিটির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন।

 

মামলার অভিযোগে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো প্রকার পূর্বানুমতি, লাইসেন্স বা কপিরাইট স্বত্ব গ্রহণ না করেই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই গানটি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, যা একজন সৃজনশীল শিল্পীর মেধা স্বত্ব এবং তার ব্যক্তিগত আদর্শের প্রতি এক চরম অবমাননা।

 

আইনি প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি আদালতের কাছে ১ কোটি মার্কিন ডলার দাবি করেছেন। নিল ইয়ংয়ের দায়ের করা এই মামলাটি কেবল একটি কপিরাইট লঙ্ঘনের সাধারণ ও গতানুগতিক অভিযোগ নয়, বরং এর শেকড়ে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর আদর্শিক ও দার্শনিক দ্বন্দ্ব।

 

মামলার আইনি নথিতে ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রকিন ইন দ্য ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ গানটির অন্তর্নিহিত অর্থ, এর গানের কথা এবং এর সৃষ্টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত বিশদ ও মর্মস্পর্শীভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই গানটি মূলত একটি জোরালো রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদী সংগীত।

 

গানটির পরতে পরতে মার্কিন রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া দীর্ঘদিনের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি এবং তথাকথিত ‘স্বাধীন বিশ্বের’ চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমাজের এক নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে কটাক্ষ করা হয়েছে।

 

সমাজের নিম্নবিত্ত, দরিদ্র, গৃহহীন, সুবিধাবঞ্চিত এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দ্বারা চরমভাবে উপেক্ষিত সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের কঠিন জীবন সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার আকুতিই মূলত এই গানের মূল উপজীব্য বিষয়।

 

সংগীতশিল্পী নিল ইয়ংয়ের নিজস্ব মতাদর্শ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শন, তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের গৃহীত বিভিন্ন নীতি এবং তার উগ্র ডানপন্থী অবস্থানের সঙ্গে এই গানের মূল মানবিক সুর ও সমাজতান্ত্রিক চেতনার সম্পূর্ণ এবং মেরুসম বৈপরীত্য রয়েছে।

 

আদালতের নথিতে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, গানটির সাম্যবাদী ও মানবিক বক্তব্য কোনোভাবেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভাজনমূলক ও পুঁজিপতি-বান্ধব রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

বরং যে সমাজের বঞ্চনার বিরুদ্ধে এই গানটি রচিত হয়েছিল, ট্রাম্পের নীতিগুলো সেই বঞ্চনাকেই আরও বেশি ত্বরান্বিত করে বলে শিল্পী মনে করেন। তাই এমন একজন নেতার প্রচারণায় এই গানের ব্যবহার শিল্পীর জন্য চরম অবমাননাকর।

 

সংগীতশিল্পী নিল ইয়ংয়ের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আইনি, আদর্শিক ও নৈতিক সংঘাত একেবারেই নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এক দীর্ঘ ও তিক্ত ইতিহাস। ইয়ংয়ের দাবি অনুযায়ী, এর আগে যখন এই একই গানটি রাজনৈতিক ময়দানে ব্যবহার নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা নির্বাচনী প্রচারে তার এই সৃষ্টি আর কখনোই কোনোভাবেই ব্যবহার করা হবে না।

 

কিন্তু ওহাইওর সমাবেশে সেই গানটি পুনরায় বাজানোর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার সেই প্রতিশ্রুতির চরম বরখেলাপ করেছেন বলে শিল্পী তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় ঠিক একইভাবে এই গানটি ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি ফেডারেল মামলা দায়ের করেছিলেন নিল ইয়ং।

 

সে সময় বর্ষীয়ান এই শিল্পী অভিযোগ করেছিলেন যে, তার সৃষ্টিকে এমন একটি বিভাজনমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ ও অসহিষ্ণু রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে যা তিনি ব্যক্তিগতভাবে তীব্র ঘৃণা করেন। যদিও পরবর্তীতে কপিরাইট আইনের কিছু জটিলতা এবং অজানা কারণে তিনি সেই মামলাটি স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

 

তবে এবারের পরিস্থিতি ও আইনি ভিত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং শিল্পী তার অধিকার আদায়ের অবস্থানে এবার অত্যন্ত অনড় ও আপসহীন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারণার দীর্ঘ ইতিহাসে সংগীতশিল্পীদের বিনা অনুমতিতে গান ব্যবহার নিয়ে এমন আইনি জটিলতা এবারই প্রথম নয়।

 

তবে এটি সত্য যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এমন অভিযোগ বারবার এবং সবচেয়ে বেশি মাত্রায় সামনে এসেছে। এর আগে রোলিং স্টোনস, অ্যাডেল, রিহানা, ব্রুস স্প্রিংস্টিন, অ্যারোস্মিথ থেকে শুরু করে এলটন জনের মতো বিশ্ববিখ্যাত কিংবদন্তি শিল্পীরাও ট্রাম্পের প্রচারণায় তাদের আইকনিক গানের অননুমোদিত ব্যবহারের তীব্র ও প্রকাশ্য প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

 

অনেক শিল্পীই প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে, তারা কস্মিনকালেও চান না তাদের কষ্টার্জিত শিল্পকর্ম এমন কোনো নেতার প্রচারণায় ব্যবহৃত হোক, যার রাজনৈতিক ও সামাজিক নীতির সঙ্গে তাদের নিজস্ব মতাদর্শের বিন্দুমাত্র মিল নেই।

 

মূলত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বিশাল জনসমাবেশে সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে এবং একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করতে অত্যন্ত সুকৌশলে জনপ্রিয় ও আইকনিক গানগুলো ব্যবহার করে থাকে।

 

অনেক সময় তারা ‘পারফর্মিং রাইটস অর্গানাইজেশন’ থেকে ব্ল্যাংকেট বা সাধারণ লাইসেন্স নিয়ে থাকে, কিন্তু মেধা স্বত্ব আইন বা কপিরাইট আইনের ফাঁকফোকর গলে অনেক সময়ই শিল্পীর সরাসরি পূর্বানুমতি নেওয়া হয় না।

 

বিশেষ করে যখন বিষয়টি শিল্পীর নৈতিক অধিকার বা ‘মোরাল রাইটস’ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখন এই আইনি লড়াইগুলো অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করে। নিল ইয়ংয়ের এই সাহসী আইনি পদক্ষেপ মূলত মার্কিন রাজনৈতিক প্রচারণার সেই একচেটিয়া সংস্কৃতিকেই একটি বড়সড় ও যুগান্তকারী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

 

বর্তমান এই হাই-প্রোফাইল মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের আবহে এক নতুন মাত্রার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী শিবির বা ‘ট্রাম্প ৪৭’ কমিটি এই স্পর্শকাতর বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা আইনি বিবৃতি প্রদান করেনি।

 

তবে আন্তর্জাতিক আইনি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মেধা স্বত্ব আইন, শিল্পীর ব্যক্তিগত নৈতিক অধিকার রক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রচারণার সীমানা নির্ধারণের প্রশ্নে এই মামলাটি আগামী দিনগুলোতে মার্কিন রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।

 

নির্বাচনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে এমন একটি বড় অঙ্কের আর্থিক ও সম্মানহানির মামলা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণার সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে ঠিক কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।

 

তবে এটি এখন দিনের আলোর মতোই অত্যন্ত স্পষ্ট যে, সৃজনশীল কর্মের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ মার্কিন প্রেসিডেন্টের চলমান রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের দীর্ঘ তালিকায় আরও একটি বড়, বিতর্কিত ও অত্যন্ত জটিল অধ্যায় যুক্ত করেছে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি