রবিবার, নভেম্বর ১, ২০২৬
১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার কোনো সুযোগ ইরানকে দেওয়া হবে না: যুক্তরাষ্ট্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম

বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার কোনো সুযোগ ইরানকে দেওয়া হবে না: যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই ইরানকে সমগ্র অঞ্চল এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার সুযোগ দেবে না।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা একদিকে যেমন কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রেখেছে, তেমনি অন্যদিকে যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতেও সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

 

রোববার বাহরাইনের রাজধানী মানামায় আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলন 'মানামা ডায়ালগ'-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বা নিকট-প্রাচ্য বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড ব্লোম এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী মন্তব্য করেন।

 

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কৌশলগত জলপথটি পারস্য উপসাগরকে উন্মুক্ত সমুদ্রের সাথে যুক্ত করেছে, যার ওপর দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়।

 

এই নৌপথের নিরাপত্তা ও অবাধ নৌ চলাচল বিন্দুমাত্র ব্যাহত হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে ইরানের বিভিন্ন পদক্ষেপ, হুমকি ও সামরিক তৎপরতার কারণে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে এক ধরনের উদ্বেগজনক ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে মূলত এই গভীর আশঙ্কার দিকটিই তুলে ধরেছেন। ডোনাল্ড ব্লোম অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, "আমরা কিছুতেই ইরানকে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার মতো কোনো সুযোগ দিতে পারি না।"

 

তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের অবরোধ বা অস্থিতিশীলতা বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা ঠেকাতে ওয়াশিংটন নীতিগতভাবে বদ্ধপরিকর।

 

তবে যুক্তরাষ্ট্র যে কেবল সামরিক বা কঠোর পদক্ষেপের কথাই বলছে, বিষয়টি এমন নয়; বরং তারা একটি টেকসই কূটনৈতিক সমাধানের ওপরও সমানভাবে জোর দিচ্ছে। ডোনাল্ড ব্লোম তার বক্তব্যে ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিক আলোচনার সদিচ্ছার কথা পুনরায় ব্যক্ত করেছেন।

 

তিনি জানান, ওয়াশিংটন সবসময়ই গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসী। তিনি বলেন, "আমরা ইরানের প্রতি আলোচনার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি এবং আমাদের সেই কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো এখনও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও সক্রিয় রয়েছে।"

 

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান যেন কোনো ধরনের সামরিক উসকানি বা বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করার মতো অবরোধের পথে না হেঁটে আলোচনার টেবিলে বসে তাদের ন্যায্য উদ্বেগগুলো নিরসন করে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরাশক্তির পক্ষ থেকে এই ধরনের প্রকাশ্য বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম বিকল্প হিসেবে সবসময়ই কূটনীতি ও সংলাপকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

 

কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা অত্যন্ত জোর দিয়ে বললেও, ওয়াশিংটন তাদের বিকল্প প্রস্তুতির কথাও কোনোভাবেই গোপন রাখেনি। মার্কিন প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তা অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তেহরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যদি হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসে এবং ইরান যদি তাদের অনড় ও আগ্রাসী অবস্থান থেকে সরে না দাঁড়ায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটতে বাধ্য হবে।

 

ডোনাল্ড ব্লোম বলেন, "একই সাথে, আমরা অন্য যেকোনো দিকে যাওয়ার জন্যও সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছি।" এই 'অন্য দিক' বলতে মূলত ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা, আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠন করে ওই নৌপথে টহল ও নজরদারি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা এবং প্রয়োজনে কৌশলগত সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের মতো অত্যন্ত কঠোর বিষয়গুলোকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এই সুপরিকল্পিত দ্বিমুখী কৌশল-একদিকে কূটনীতির প্রস্তাব এবং অন্যদিকে কঠোর প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতির প্রকাশ্য ঘোষণা—ইরানের নীতি-নির্ধারকদের ওপর একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

বাহরাইনে আয়োজিত 'মানামা ডায়ালগ' মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক নিরাপত্তা সম্মেলন হিসেবে বিশ্বজুড়ে বিবেচিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, সামরিক কর্মকর্তা এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা এই সম্মেলনে সমবেত হয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে অত্যন্ত বিশদ আলোচনা করেন।

 

এমন একটি আন্তর্জাতিক ও উচ্চপর্যায়ের ফোরামে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ধরনের কঠোর বার্তা প্রদান আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য একটি বড় ধরনের আশ্বাসের বিষয়।

 

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হরমুজ প্রণালির অবাধ চলাচলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা দীর্ঘদিন ধরেই ওই অঞ্চলে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি সেই আরব মিত্রদের এই সুস্পষ্ট বার্তাই দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের পাশে ছায়ার মতো রয়েছে এবং যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ যৌথভাবে রুখে দিতে তারা বদ্ধপরিকর।

 

বিশ্ব অর্থনীতি যখন কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে এমনিতেই এক ধরনের ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনিতে কোনো ধরনের বাধা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও ভয়াবহভাবে উসকে দিতে পারে।

 

তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেলে তা উন্নত থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল-সব দেশের অর্থনীতির ওপরই এক বিশাল ও অপূরণীয় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার মতো এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

 

মূলত এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের গভীর আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইরানকে আন্তর্জাতিক ফোরামে সতর্ক করছে। আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের একটি অন্যতম প্রধান ও অলঙ্ঘনীয় ভিত্তি।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, এই সর্বজনীন অধিকার ক্ষুণ্ন করে কোনো রাষ্ট্র নিজের রাজনৈতিক বা কৌশলগত ফায়দা লুটতে পারে না। পরিশেষে বলা যায়, ডোনাল্ড ব্লোমের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্দেশনামূলক রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।

 

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আগামী দিনগুলোতে ঠিক কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এবং তেহরানের দূরদর্শিতার ওপর।

 

ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের এই আলোচনার প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে একটি সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে, তবে তা সমগ্র বিশ্বের জন্যই একটি পরম স্বস্তির খবর হবে। কিন্তু এর বিপরীতে তারা যদি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলার ধ্বংসাত্মক কৌশল অব্যাহত রাখে, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বে এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের দাবানল ছড়িয়ে দিতে পারে, যার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

 

এখন দেখার বিষয়, তেহরান ওয়াশিংটনের এই সতর্কবার্তা ও কূটনৈতিক প্রস্তাবকে কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং আগামী দিনগুলোতে তাদের কৌশলগত ও সামরিক পদক্ষেপ কী হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত গভীর মনোযোগ ও উৎকণ্ঠার সাথে এই পরিস্থিতির প্রতিটি পালাবদল পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এর ওপরই নির্ভর করছে আগামী বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

 

- আল জাজিরা