মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউক্রেনে আইন ও সৈন্য সমাবেশের মেয়াদ বাড়াল আরও ৯০ দিন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম

ইউক্রেনে আইন ও সৈন্য সমাবেশের মেয়াদ বাড়াল আরও ৯০ দিন
ছবি : Collected

রাশিয়ার সাথে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র সংঘাতের পটভূমিতে ইউক্রেনের জাতীয় পার্লামেন্ট দেশে জারি থাকা বিশেষ সামরিক আইন এবং দেশব্যাপী সাধারণ সৈন্য সমাবেশের মেয়াদ আরও ৯০ দিনের জন্য বৃদ্ধি করার পক্ষে ঐতিহাসিক ভোট দিয়েছে।

 

নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত এই বিশেষ প্রশাসনিক আইন ও সামরিক তৎপরতা কার্যকর থাকবে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের এই নিরাপত্তা ও কৌশলগত পদক্ষেপটি দেশটির বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

ইউক্রেনের একক কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় আইনসভা 'ভেরখোভনা রাদা'-এর প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ভোটাভুটির আনুষ্ঠানিক ফলাফল থেকে জানা যায়, দেশের আইনপ্রণেতারা এই দুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রস্তাবের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।

 

এর মধ্যে দেশে চলমান সামরিক আইনের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ৩১৩ জন সংসদ সদস্য তাদের মূল্যবান ভোট প্রদান করেন। অন্যদিকে, দেশের সাধারণ নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তকরণ বা সাধারণ সৈন্য সমাবেশের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৩১১ জন আইনপ্রণেতা।

 

এই ভোটাভুটি ইউক্রেনের আইনসভার বিশেষ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে গভীর আলোচনা করা হয়।

 

এই আইনগত প্রক্রিয়াটির সূচনা হয়েছিল গত সোমবার, যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিজে এই সংক্রান্ত দুটি পৃথক ও জরুরি খসড়া আইনে স্বাক্ষর করে তা অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টে পেশ করেন।

 

রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দুটি জমা দেওয়ার পরদিনই অর্থাৎ মঙ্গলবার ইউক্রেনীয় আইনপ্রণেতারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এর ওপর ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করেন। বর্তমান সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, পার্লামেন্টে প্রস্তাব দুটি পাস হলেও এটি চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হতে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে পুনরায় ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির চূড়ান্ত স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে।

 

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যেহেতু খোদ প্রেসিডেন্টের ইচ্ছায় এই বিল আনা হয়েছে, তাই এটি একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া মাত্র এবং খুব শীঘ্রই এতে চূড়ান্ত স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে। ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই বিশেষ আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর প্রভাব বিস্তারকারী।

 

এর আগে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এক পূর্ণাঙ্গ ও ভয়াবহ যুদ্ধে রূপ নেয়, ঠিক সেই দিনই প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দেশে প্রথমবারের মতো জরুরি ভিত্তিতে সামরিক আইন জারির পাশাপাশি সাধারণ সৈন্য সমাবেশের ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন।

 

সেই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেশটির সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে এই কঠোর প্রশাসনিক ও সামরিক পদক্ষেপের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। মঙ্গলবারের এই সর্বশেষ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত রেকর্ড ২০ বারের মতো এই জরুরি ব্যবস্থার মেয়াদ পুনর্নবীকরণ করা হলো, যা দেশটির দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বাস্তব চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে ফুটিয়ে তোলে।

 

দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা, জাতীয় অর্থনীতি এবং সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে এই বিশেষ সামরিক আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

 

সামরিক আইন কার্যকর থাকার ফলে দেশটির আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীকে অতিরিক্ত ও বিশেষ প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় তাৎক্ষণিক ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

 

একই সাথে সাধারণ সৈন্য সমাবেশ বা যুদ্ধকালীন মোবিলাইজেশনের আওতায় দেশের নির্দিষ্ট বয়সী সক্ষম নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে দেশের প্রতিরক্ষায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

 

এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার মেয়াদ অক্টোবর মাসের শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ইউক্রেনীয় নীতিনির্ধারকেরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, তারা যেকোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য নিজেদের প্রশাসনিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি সম্পূর্ণভাবে ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনীয় পার্লামেন্টের এই পদক্ষেপটি কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের অটল অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রেও একটি বড় ভূমিকা পালন করবে। একই সাথে এটি আগামী দিনগুলোতে পূর্ব ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রণক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি