মঙ্গলবার ইউক্রেনের পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তার এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে। এই অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কোনো কারণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ব্যাখ্যা না করলেও, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। চল্লিশ বছর বয়সী প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোর পদত্যাগপত্র গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি মঙ্গলবার পার্লামেন্টের অধিবেশনে পাস হয়।
তবে যুদ্ধের মতো এমন একটি চূড়ান্ত ও সংকটময় মুহূর্তে দেশের শীর্ষ প্রশাসনে এমন আকস্মিক পরিবর্তনে বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা গভীর অসন্তোষ ও অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অবশ্য এই রদবদলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন তার সামগ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কৌশল পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আর এই নতুন কৌশল বাস্তবায়নের জন্যই সরকারে নতুন মুখের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তবে এর বাইরে মন্ত্রিসভায় এই ব্যাপক রদবদল আনার আর কোনো স্পষ্ট কারণ তিনি জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি।
পার্লামেন্টে দেওয়া নিজের বিদায়ী ভাষণে ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কো তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত এক বছরের প্রতিটি দিনই তার জন্য ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং প্রতিটি মুহূর্তেই অত্যন্ত কঠিন ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল।
দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে তিনি যে অগাধ বিশ্বাস ও সমর্থন পেয়েছেন, তার জন্য তিনি সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তিনি সব সময়ই কাজের চূড়ান্ত ফলাফলে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন।
উল্লেখ্য, ইউক্রেনের শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িয়ে বড় ধরনের একটি দুর্নীতির কেলেঙ্কারি জনসমক্ষে আসার পর, প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করার একটি বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঠিক এক বছর আগে ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোকে মন্ত্রিসভার এই সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
সে সময় দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল তিনি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দুর্নীতি দূর করতে বা প্রশাসনে কার্যকর কোনো শুদ্ধি অভিযান চালাতে তিনি যথেষ্ট পরিমাণ দৃঢ় ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন বলে সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন।
সরকারের এই ব্যর্থতা নিয়ে দেশটির বিরোধী দল হোলোস-এর আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক বিদায়ী সরকারের অত্যন্ত কড়া সমালোচনা ও উপহাস করেছেন। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, বর্তমান সরকার প্রতিদিন দেশবাসীকে ভালো ফলাফলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং তারা এক অর্থে সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছেও।
তবে সেই ফলাফল হলো প্রতিদিন কেবল নতুন নতুন প্রেজেন্টেশন দেখানো, প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন করে আশার বাণী শোনানো এবং সবশেষে প্রতিদিন দুর্নীতির নতুন একটি মামলায় নতুন একজন সন্দেহভাজনকে খুঁজে পাওয়া। বিরোধী দলের এই মন্তব্য সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
ইউক্রেনের সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো সরকারেরই পতন বা পদত্যাগ নিশ্চিত হয়েছে। ফলে এখন কিয়েভকে একটি সম্পূর্ণ নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে হবে।
আইনপ্রণেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি নাফতোগাজ-এর প্রধান সের্হি কোরেতস্কি নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন।
এছাড়া অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোর পূর্বসূরি ডেনিস শমিহাল এবং বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের নামও রাজনৈতিক মহলে জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।
দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের এক রক্তক্ষয়ী ও সর্বাত্মক যুদ্ধ চলমান রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনীয় বাহিনী মস্কোর বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করছে।
এমন একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রীর মূল দায়িত্ব হলো দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতি পরিচালনা করা, মুখ থুবড়ে পড়া অর্থনীতিকে যেকোনো মূল্যে সচল রাখা এবং রাশিয়ার অবিরাম বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বেসামরিক অবকাঠামোগুলোর মেরামত কাজ নিবিড়ভাবে তদারকি করা।
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কো তার ভাষণে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তাও দিয়ে গেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আসন্ন নতুন সরকার ও প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হবে আসন্ন শীতকালের জন্য দেশকে প্রস্তুত করা।
কারণ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, আসন্ন প্রচণ্ড শীতকালে ইউক্রেনের নাজুক বিদ্যুৎ গ্রিড এবং গ্যাস লাইনগুলোর ওপর রাশিয়ার হামলার মাত্রা ও তীব্রতা অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে এই আসন্ন মানবিক ও কাঠামোগত বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য এখন থেকেই অত্যন্ত সুচারু ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।