বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৬০ বছর আগে স্পেনে চারটি পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

৬০ বছর আগে স্পেনে চারটি পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : BBC

স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময় ষাটের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য যেকোনো হামলা আগেভাগে ঠেকাতে ‘ক্রোম ডোম’ নামক একটি অত্যন্ত গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক প্রকল্প হাতে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

 

এই প্রকল্পের আওতায় পারমাণবিক অস্ত্রবাহী মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমানগুলো নিয়মিত আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় টহল দিত, যাতে নির্দেশ পাওয়ামাত্রই মস্কোতে আক্রমণ চালানো সম্ভব হয়। তবে দীর্ঘক্ষণ আকাশে অবস্থান করার জন্য এই বোমারু বিমানগুলোর মাঝ আকাশে জ্বালানি সংগ্রহের প্রয়োজন হতো।

 

আর এই মাঝ আকাশে জ্বালানি সংগ্রহের প্রক্রিয়াই জন্ম দিয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক পারমাণবিক দুর্ঘটনার। ১৯৬৬ সালের ১৭ জানুয়ারি দক্ষিণ স্পেনের আলমেরিয়া অঞ্চলের আকাশে এমন একটি নিয়মিত টহল অভিযান চলছিল।

 

ভূমি থেকে প্রায় ৩১ হাজার ফুট উঁচুতে একটি বি-৫২ বোমারু বিমান কেসি-১৩৫ নামক একটি ট্যাঙ্কার বিমান থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক বিপর্যয়। বোমারু বিমানটির সঙ্গে জ্বালানি ট্যাঙ্কারের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয় এবং কেসি-১৩৫ বিমানে থাকা বিপুল পরিমাণ জেট জ্বালানি মুহূর্তের মধ্যে বিস্ফোরিত হয়।

 

এই প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণে ট্যাঙ্কার বিমানের চারজন ক্রু ঘটনাস্থলেই নিহত হন। একই সঙ্গে বি-৫২ বিমানের লেজের অংশে থাকা আরও দুজন ক্রু প্রাণ হারান। তৃতীয় একজন ক্রু প্যারাসুট ব্যবহার করে বাঁচার চেষ্টা করলেও সেটি না খোলায় তারও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

 

তবে ধ্বংস হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বোমারু বিমানটির বাকি চারজন সদস্য সফলভাবে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিমানটির জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ এবং এতে থাকা চারটি প্রাণঘাতী থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা স্পেনের পালমারেস নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ওপর বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে শুরু করে।

 

আকাশে সৃষ্ট বিশাল আগুনের গোলাটি এক মাইল দূর থেকেও স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। তবে বিশ্ববাসীর জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয় ছিল যে, ওই দিন সেখানে কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটেনি।

 

কারণ বোমারু বিমানের ওয়ারহেডগুলো তখন সক্রিয় অবস্থায় ছিল না এবং সেগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন রোধ করার জন্য অত্যাধুনিক ও মজবুত সুরক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল।

 

পারমাণবিক বিস্ফোরণ না হলেও বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। থার্মোনিউক্লিয়ার ডিভাইসগুলোর ভেতরে ট্রিগার মেকানিজমের অংশ হিসেবে প্লুটোনিয়াম কোরের চারপাশে প্রচলিত বিস্ফোরক পদার্থ ছিল। দুর্ঘটনার সময় বোমাগুলোর সঙ্গে প্যারাসুট যুক্ত থাকার কথা ছিল, যাতে ভূমিতে আঘাতের তীব্রতা কমে এবং তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে না পড়ে।

 

বাস্তবে একটি অবিস্ফোরিত বোমা নদীর তীরে নিরাপদে পড়েছিল এবং পরের দিন সেটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অন্য দুটি বোমার প্যারাসুট খুলতে ব্যর্থ হয়। এর মধ্যে একটি হাইড্রোজেন বোমা একটি কবরস্থানের কাছে প্রচণ্ড বেগে মাটিতে আছড়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়।

 

এই বিস্ফোরণগুলোর ফলে মাটিতে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয় এবং কয়েকশ একর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অত্যন্ত বিষাক্ত তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়ামের ধুলো ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিমানের জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষও পুরো গ্রামজুড়ে আছড়ে পড়েছিল।

 

পারমাণবিক অস্ত্রসহ বোমারু বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার এই ভয়ংকর খবর মার্কিন সামরিক কমান্ডে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এক বিশাল উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। দুর্ঘটনার সময় স্পেনের মাদ্রিদে মার্কিন বিমানবাহিনীর আইনজীবী হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন ক্যাপ্টেন জো রামিরেজ।

 

২০১১ সালে সংবাদমাধ্যম বিবিসির ‘উইটনেস হিস্ট্রি’ অনুষ্ঠানে সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি জানিয়েছিলেন যে, খবরটি শোনার পর কনফারেন্স রুমে উপস্থিত সবাই চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। সবার মুখে শুধু ‘ব্রোকেন অ্যারো’ শব্দটি শোনা যাচ্ছিল, যা ছিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ সামরিক সাংকেতিক কোড।

 

দ্রুততম সময়ের মধ্যে মার্কিন সেনাদের হেলিকপ্টারে করে দুর্ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা হয়। তখন পুরো এলাকা জুড়ে বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। বি-৫২ বোমারু বিমানের একটি বিশাল অংশ গ্রামের একটি স্কুলের আঙিনায় গিয়ে পড়েছিল।

 

কিন্তু এত বড় বিপর্যয়ের পরও অলৌকিকভাবে গ্রামের কোনো মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি। দুর্ঘটনার বছর দুয়েক পর সেখানে অনুসন্ধানে যাওয়া বিবিসির সাংবাদিক ক্রিস ব্রাশার বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন যে, গ্রামের ওপর প্রায় ১০০ টন জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ পড়লেও একটি মুরগিরও মৃত্যু হয়নি।

 

এদিকে বি-৫২ বিমান থেকে যে তিনজন ক্রু প্যারাসুটের সাহায্যে বেরিয়ে এসেছিলেন, তারা উপকূল থেকে কয়েক মাইল দূরে ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়েন। দুর্ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় তারা উদ্ধার পান। চতুর্থ জন, যিনি বিমানের রাডার-নেভিগেটর ছিলেন, বিস্ফোরণের সময় বেরিয়ে আসলেও মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।

 

ইজেকশন সিট থেকে নিজেকে আলাদা করতে না পারলেও তিনি প্যারাসুট খুলতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে তাকে গ্রামের কাছাকাছি জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এরপর শুরু হয় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ-নিখোঁজ পারমাণবিক অস্ত্রগুলো খুঁজে বের করা।

 

উদ্ধার অভিযানের দায়িত্বে থাকা জেনারেল উইলসন ১৯৬৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, বোমাগুলো উদ্ধার করাই ছিল তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দুর্ঘটনার প্রথম রাতেই স্পেনের জাতীয় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা পালমারেসের একমাত্র বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা একটি বারে এসে একটি বোমার সন্ধান দেন।

 

পরের দিন সকালের আলো ফুটতেই তল্লাশি জোরদার করা হয় এবং সকালের মধ্যেই আরও দুটি বোমা উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে তিনটি বোমা পাওয়া গেলেও একটি পারমাণবিক বোমা তখনও নিখোঁজ ছিল। এই চতুর্থ ওয়ারহেডটি খুঁজে বের করার জন্য পালমারেসের সমুদ্র সৈকত প্রায় সাতশো মার্কিন বিমানসেনা ও বিজ্ঞানীর একটি অস্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত হয়।

 

সপ্তাহব্যাপী তন্নতন্ন তল্লাশির পরও যখন কোনো খোঁজ মিলছিল না, তখন একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন স্থানীয় এক জেলে। তিনি ক্যাপ্টেন রামিরেজের কাছে বারবার ক্ষমা চেয়ে বলছিলেন যে, তিনি একজন মার্কিন সেনাকে সমুদ্রে তলিয়ে যেতে দেখেছেন, কিন্তু তাকে বাঁচাতে পারেননি।

 

দূরদর্শী ক্যাপ্টেন রামিরেজ বুঝতে পারেন, ওই জেলে আসলে নিখোঁজ পারমাণবিক বোমাটিকেই ডুবতে দেখেছেন, কারণ নিহত সব ক্রুর মরদেহ আগেই উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপরই তল্লাশি অভিযান ভূমধ্যসাগরের দিকে মোড় নেয়।

 

মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রের তলদেশ চষে বেড়ানোর জন্য মাইন-সুইপার এবং সাবমার্সিবলসহ ত্রিশটিরও বেশি জাহাজের এক বিশাল বহর মোতায়েন করে। এটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও ধীরগতির এক প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া।

 

কয়েক সপ্তাহের অক্লান্ত চেষ্টার পর ‘অ্যালভিন’ নামের একটি অত্যাধুনিক ডুবোযানের সাহায্যে সাগরের তলদেশের একটি গভীর খাদে নিখোঁজ বোমাটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় চার মাস পর ওয়ারহেডটি নিরাপদে উদ্ধার করে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

 

সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেছে, কিন্তু পালমারেস গ্রামের বুকে সেই ক্ষত আজও রয়ে গেছে। তেজস্ক্রিয়তার কারণে আজও সেখানকার প্রায় ১০০ একর জমি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৫ সালে স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র অবরুদ্ধ ওই এলাকাটিকে সম্পূর্ণভাবে তেজস্ক্রিয়তামুক্ত ও পরিষ্কার করার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

 

বিবিসি