দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘোষিত মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ইউক্রেনের পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিয়োগ অনুমোদন করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটি ইউক্রেনীয় সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বে তৃতীয় বড় পরিবর্তন।
যুদ্ধকালীন কঠিন সময়ে ইউক্রেনের সামগ্রিক বেসামরিক প্রশাসন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সামলানোর মতো অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব এখন অর্পিত হয়েছে এই নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাঁধে। এর আগে দেশটির সরকার পরিচালনায় থাকা দুই প্রধানমন্ত্রীর পর তিনি এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকে একটি স্থিতিশীল কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন।
চল্লিশোর্ধ্ব বয়সী সের্গেই কোরেৎস্কি পেশাগত জীবনে একজন সফল প্রকৌশলী এবং দক্ষ অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। তবে ইউক্রেনের রাজনৈতিক মহলে তিনি সম্পূর্ণ নতুন এক মুখ। এর আগে তিনি কখনো কোনো সরকারি লাভজনক পদে দায়িত্ব পালন করেননি এবং দেশের কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হওয়া এবং একজন নিবেদিত ও দক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে তার যে সুখ্যাতি রয়েছে, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের হাল ধরার ক্ষেত্রে তার জন্য একটি বড় সুবিধা হিসেবে কাজ করবে।
ইউক্রেনীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান পেন্টা থিংক ট্যাংকের পরিচালক ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর মতে, চলমান যুদ্ধাবস্থায় রাজনৈতিক জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কোরেৎস্কির মতো একজন অভিজ্ঞ পেশাদার ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্বই এই পদের জন্য সবচেয়ে বেশি যোগ্য।
নতুন এই প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় জ্বালানি খাতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের কাজের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। তেল উৎপাদন, জ্বালানি তেল পরিশোধন, খুচরা ও পাইকারি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং জটিল আন্তর্জাতিক অর্থায়নের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন।
বিশেষ করে, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে তিনি ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ‘নাফতোগাজ’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটি মূলত যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও পুরো ইউক্রেনের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি এবং দেশজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনার প্রধান চালিকাশক্তি।
নাফতোগাজের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি একই গ্রুপভুক্ত ইউক্রেনের বৃহত্তম তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইউক্রনাফতা’রও শীর্ষ পদে সুনামের সঙ্গে নিয়োজিত ছিলেন। রাষ্ট্রায়ত্ত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ দেওয়ার আগে কোরেৎস্কি বেসরকারি খাতের একাধিক স্বনামধন্য জ্বালানি সংস্থায় নিজের নেতৃত্বগুণ প্রমাণ করেছেন।
তিনি দীর্ঘদিন সফলতার সঙ্গে ওয়েস্টর্ন অয়েল গ্রুপ, কন্টিনিয়াম গ্রুপ এবং ইউক্রেনের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি স্টেশন চেইন ডব্লিউজিওজি’র প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর লুতস্কে জন্মগ্রহণ করা এই উদ্যোক্তা নিজ উদ্যোগে একটি সফল কফি চেইন ব্যবসাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা হয়।
তার এই বৈচিত্র্যময় পেশাদার জীবন ও ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা যুদ্ধকালীন ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুনর্গঠনে বিশেষ সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর কোরেৎস্কির সামনে অপেক্ষা করছে পর্বতসম কঠিন সব চ্যালেঞ্জ।
রাশিয়ার অব্যাহত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডসহ সার্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা বর্তমানে চরম বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় তার প্রধান ও সবচেয়ে জরুরি পরীক্ষা হবে আসন্ন তীব্র শীত মৌসুমে দেশবাসীর জন্য বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা sচল রাখা।
গত শীতের তীব্র ঠান্ডায় রুশ বাহিনীর উপর্যুপর হামলায় ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এখনো সম্পূর্ণ মেরামত করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে শত্রুর আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও তীব্র ঘাটতি রয়েছে দেশটিতে।
এই ভয়াবহ সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নতুন মন্ত্রিসভার লক্ষ্য নির্ধারণ করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, আসন্ন শীত মৌসুমে দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের একমাত্র ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এই চরম যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় সের্গেই কোরেৎস্কি কীভাবে দেশকে এই আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে পুরো বিশ্ব।