মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউক্রেন যুদ্ধে সামরিক সমর্থনের জন্য উত্তর কোরিয়াকে ধন্যবাদ জানালেন পুতিন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধে সামরিক সমর্থনের জন্য উত্তর কোরিয়াকে ধন্যবাদ জানালেন পুতিন
ছবি: সংগৃহীত

পূর্ব ইউরোপে চলমান ইউক্রেন সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ভূরাজনীতিতে মেরুকরণ যখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার সম্পর্ক আরও এক ধাপ সুদৃঢ় হলো। ইউক্রেনে পরিচালিত সামরিক অভিযানে রাশিয়ার প্রতি নিঃশর্ত ও অব্যাহত সমর্থন জানানোর কারণে উত্তর কোরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

 

রোববার, ১৯ জুলাই রাশিয়া সফররত উত্তর কোরিয়ার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী চোয়ে সন হুইয়ের সঙ্গে ক্রেমলিনে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে তিনি এই গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী চাপ এবং কূটনৈতিক একঘরে অবস্থার মধ্যে থাকা এই দুই দেশের এমন প্রকাশ্য হৃদ্যতা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমরবিদ্যার বিশ্লেষকরা।

 

ক্রেমলিনের প্রকাশ করা একটি আনুষ্ঠানিক ভিডিও বার্তায় দেখা যায়, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অবদানকে স্মরণ করছেন। বৈঠকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইউক্রেনে রাশিয়ার পরিচালিত 'বিশেষ সামরিক অভিযান'-এ পিয়ংইয়ং যে কৌশলগত ও সামরিক সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে, তার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।

 

পুতিন জোর দিয়ে বলেন, রণাঙ্গনে উত্তর কোরিয়ার সেনাসদস্যরা যে অভাবনীয় সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তা রাশিয়া কোনো দিনই বিস্মৃত হবে না। এমনকি এই বিদেশি সেনাদের রাশিয়ার নিজ দেশের নাগরিকদের মতোই সমমর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করা হবে বলেও তিনি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন।

 

এই আলোচনার সময় উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার গড়ে ওঠা চমৎকার ব্যক্তিগত রসায়ন, পারস্পরিক অগাধ আস্থা এবং চমৎকার বোঝাপড়ার বিষয়টিও অত্যন্ত প্রশংসার সঙ্গে উল্লেখ করেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

 

কূটনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের পটভূমি তৈরি হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগেই। এর আগে শনিবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয় যে, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের বিশেষ আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে একটি সরকারি সফরে মস্কোয় এসে পৌঁছেছেন উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চোয়ে সন হুই।

 

আন্তর্জাতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা এই দুই মিত্র রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এমন নিয়মিত আদান-প্রদান বিশ্বমঞ্চে তাদের ঐক্যের একটি জোরালো বার্তা দিচ্ছে। লাভরভ এবং চোয়ে সন হুইয়ের মধ্যকার এই বৈঠককে দুই দেশের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে মস্কো এবং পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অভাবনীয়ভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

 

পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া যখন নতুন মিত্রের সন্ধান করছিল, তখন উত্তর কোরিয়া অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, উত্তর কোরিয়া কেবল রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে নিজেদের সুদক্ষ সেনা মোতায়েন করেছে।

 

এর পাশাপাশি মস্কোর নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা করার লক্ষ্যে পিয়ংইয়ং বিপুল পরিমাণ আধুনিক মারণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। বিশেষ করে, সম্মুখ সমরে যখন সামরিক সরঞ্জামের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, তখন পিয়ংইয়ংয়ের এই অস্ত্র সরবরাহ রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অবস্থানকে রণাঙ্গনে আরও সংহত করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের এই মিত্রতা কেবল একতরফা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী পারস্পরিক স্বার্থের সমীকরণ। ইউক্রেন যুদ্ধে এই ব্যাপক সামরিক ও কৌশলগত সহায়তার বিনিময়ে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা লাভ করছে।

 

একইসঙ্গে, নিজেদের দেশের চরম খাদ্য সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পাচ্ছে পিয়ংইয়ং।

 

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখে, তখন রাশিয়ার কাছ থেকে প্রাপ্ত এই বহুমুখী সহায়তা পিয়ংইয়ংয়ের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রাণভোমরা হিসেবে কাজ করছে।

 

মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সখ্যের বিষয়টি গত কয়েক মাস ধরেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে রাশিয়ার একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল পিয়ংইয়ং সফরে গিয়েছিল।

 

সেই ঐতিহাসিক সফরের সময় উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন স্বয়ং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রতি তার দেশের অকুণ্ঠ ও অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। সে সময় তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন যে, যেকোনো মূল্যে ইউক্রেন রণাঙ্গনে মস্কোর চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করতে পিয়ংইয়ং সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে।

 

চলমান এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুতিনের সাম্প্রতিক এই ধন্যবাদ জ্ঞাপন মূলত সেই পূর্ববর্তী অঙ্গীকারেরই একটি সফল বাস্তবায়ন এবং দুই দেশের মধ্যকার ইস্পাতকঠিন সামরিক ঐক্যের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

- ইত্তেফাক