মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
ছবি : Collected

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও এক অভাবনীয় ও নাটকীয় পরিবর্তন সাধিত হলো। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।

 

সোমবার বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে এক আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতের পর তাকে সরকার গঠনের রাজকীয় আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের রাজনীতিতে এক অস্থির সময়ের নতুন মাইলফলক রচিত হলো।

 

গত চার বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি যুক্তরাজ্যের চতুর্থ এবং গত এক দশকের মধ্যে ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতা গ্রহণ করলেন। ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজনীতি যে কতটা গভীর অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই দ্রুত নেতৃত্ব বদলের পরিসংখ্যানেই তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।

 

সোমবারের এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের দিনটিতে বার্নহ্যামের আগে বাকিংহাম প্যালেসে যান কিয়ার স্টারমার এবং সেখানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। রাজার কাছ থেকে নতুন সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়ার পরপরই গ্রেটার ম্যানচেস্টারের এই সাবেক মেয়র সোজা চলে যান প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ডাউনিং স্ট্রিটে।

 

সেখানে মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের নাম ঘোষণার আগে উপস্থিত অসংখ্য গণমাধ্যমকর্মী ও দেশবাসীর উদ্দেশে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন তিনি, যেখানে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের ওপর জোর দেন।

 

কিয়ার স্টারমারের এই আকস্মিক পতনের নেপথ্যে রয়েছে তার বেশ কিছু রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রবণতা। তার এই অদূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশলের কারণে তিনি ক্রমান্বয়ে দলের অভ্যন্তরেই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

 

লেবার পার্টির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংসদ সদস্য এবং তার মন্ত্রিসভার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রকাশ্যে ও গোপনে তার নেতৃত্ব নিয়ে চরম অনাস্থা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ঠিক এমন একটি টালমাটাল ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই অ্যান্ডি বার্নহ্যামের রাজনৈতিক সহযোগীরা একটি সুকৌশলী ছক কষেন।

 

কিয়ার স্টারমারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই একটি উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয় এবং সেই নির্বাচনের মাধ্যমে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পুনরায় ব্রিটিশ সংসদে নিজের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেন বার্নহ্যাম। তার এই প্রত্যাবর্তন ছিল ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নিখুঁত এক কৌশলগত চাল।

 

সংসদে ফিরে আসার পর লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের লড়াইয়ে বার্নহ্যাম কার্যত একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। দল থেকে অন্য কোনো প্রভাবশালী নেতা তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ না হওয়ায় সম্পূর্ণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অত্যন্ত সীমিত পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই তিনি দলের শীর্ষ নেতা ও চূড়ান্তভাবে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে ২০২২ সালে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ঋষি সুনাকের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে সেবার ঋষি সুনাকের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন ছিল।

 

কারণ, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই তিনি লিজ ট্রাসের বিরুদ্ধে দলীয় নেতৃত্বের নির্বাচনে সরাসরি লড়াই করেছিলেন এবং এর আগে সদ্য বিদায়ী মন্ত্রিসভায় তার কাজ করার সরাসরি অভিজ্ঞতাও ছিল। অন্যদিকে, বার্নহ্যামের পথচলাটা ছিল আরও বেশি নাটকীয় ও দীর্ঘ মেয়াদের।

 

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটিশ রাজনীতিতে মোটেও কোনো নতুন মুখ নন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি এর আগেও দেশটির নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু তা-ই নয়, লেবার সরকারের সময় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদও অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সামলেছেন।

 

তবে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা থেকে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি ২০১৭ সালে সংসদীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী একজন আঞ্চলিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।

 

দীর্ঘ সাত বছর পর সেই আঞ্চলিক রাজনীতির পাট চুকিয়ে সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে তার এই অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনা করলে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনের পথটি মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ হবে না। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, স্বাস্থ্য খাতের সংকট এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক মেরামতের মতো পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ এখন তার সামনে।

 

বিদায়ী সরকারের রেখে যাওয়া অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রশমিত করে লেবার পার্টির ভেতরে একটি সুদৃঢ় ঐক্য স্থাপন করাই হবে তার প্রথম ও প্রধান কাজ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে যে, এই নবনির্বাচিত নেতার হাত ধরে ব্রিটেন বিশ্বমঞ্চে কীভাবে নিজেদের নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করে।

 

- দ্য গার্ডিয়ান