ব্রাসেলস যখন ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অস্ত্র নির্মাতাদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই ঘটনাটি মহাদেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত মূল চুক্তিতে ১০টি যুদ্ধজাহাজ তৈরির কথা থাকলেও, বর্তমান সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী মাত্র দুটি 'কনস্টেলেশন-ক্লাস' ফ্রিগেটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হবে।
মার্কিন বাণিজ্য সাময়িকীগুলোর তথ্যমতে, কাজ শুরুর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এই ফ্রিগেটগুলোর মাত্র ১০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাকি চারটি বড় জাহাজের কার্যাদেশ বাতিল করে তার পরিবর্তে উভচর অভিযান, বিশেষ মিশন এবং সম্মুখ যুদ্ধের উপযোগী ছোট আকৃতির মনুষ্যবাহী ও মনুষ্যবিহীন নৌযান তৈরি করা হবে।
ফিনক্যান্টিয়ারি জানিয়েছে, এই নতুন কার্যাদেশের মূল্যমান প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার এবং এর সাথে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তারা আরও ১ বিলিয়ন ডলার পাবে। এই সম্পূর্ণ উৎপাদন প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে অবস্থিত ফিনক্যান্টিয়ারির সহযোগী প্রতিষ্ঠান 'ফিনক্যান্টিয়ারি মেরিনেট মেরিন'-এর মাধ্যমে।
যদিও ইতালীয় সরকার কাসা ডিপোজিটি ই প্রেস্তিতির মাধ্যমে ফিনক্যান্টিয়ারির ৭১ শতাংশেরও বেশি শেয়ারের মালিক, তবুও এই বিশাল প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল ইতালি খুব একটা পাবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইতালীয় পিস অ্যান্ড ডিসআর্মামেন্ট নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফ্রান্সিসকো ভিগনারকা মন্তব্য করেছেন যে, যেহেতু কর্মীরা আমেরিকান এবং উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে হচ্ছে, তাই ইতালির অর্থনীতিতে এর অবদান হবে যৎসামান্য।
তার মতে, কোম্পানির ব্যালেন্স শিটে কিছু কর জমা হওয়া এবং বিপণনগত সুবিধা ছাড়া ইতালি এই বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের কেবল ছিটেফোঁটাই পাবে। এই চুক্তিটি এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পুনঃসশস্ত্রীকরণ এবং একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় স্বার্থ বা নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, যা ইউরোপের সমন্বিত প্রতিরক্ষা স্বপ্নের পথে বড় বাধা। ভিগনারকা সতর্ক করেছেন যে, ইউরোপীয় তহবিলগুলো যদি সঠিকভাবে কাঠামোগত না হয়, তবে তা সাধারণ ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে।
এটি অতীতের এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেখানে ইউরোপীয় প্রযুক্তি বা মেধা অন্য দেশে রপ্তানি করা হয়েছে, যেমনটি তুরস্কের কাছে ইতালির হেলিকপ্টার বিক্রির ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। ফিনক্যান্টিয়ারি অবশ্য দাবি করেছে, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে সাধারণত প্রযুক্তি রপ্তানির চেয়ে পণ্য বিক্রিই মুখ্য এবং এতে উচ্চমানের ইউরোপীয় নকশা ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে ইতালির অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান কাসা ডিপোজিটি ই প্রেস্তিতি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এটিকে ফিনক্যান্টিয়ারির নিজস্ব ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।