মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৩, ২০২৬
৩০ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

২৫ বছরের অপেক্ষার চূড়ান্ত ফয়সালা ঝুলে আছে ইতালির ওপর

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০২:২৯ পিএম

২৫ বছরের অপেক্ষার চূড়ান্ত ফয়সালা ঝুলে আছে ইতালির ওপর
ছবি: AP

দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে চলা ম্যারাথন আলোচনার পর অবশেষে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট মারকোসারের মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। আগামী ২০ ডিসেম্বর ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বহু প্রতীক্ষিত এই চুক্তিটি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ আমেরিকা সফরের পরিকল্পনা করছেন।

 

তবে ব্রাসেলসের অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা বলছেন, শেষ মুহূর্তের এই যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ নয়; বরং চুক্তিটির ভবিষ্যৎ এখন সরু সুতোর ওপর ঝুলছে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়ের সমন্বয়ে গঠিত মারকোসার জোটের সঙ্গে এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে আটলান্টিকের দুই পাড়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য এলাকা তৈরি হবে। কিন্তু ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং কৃষকদের স্বার্থরক্ষা নিয়ে সৃষ্ট গভীর বিভক্তি এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

ফ্রান্স শুরু থেকেই এই চুক্তির ঘোর বিরোধিতা করে আসছে। প্যারিসের যুক্তি, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা সস্তা কৃষি পণ্য ইউরোপের স্থানীয় কৃষকদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করবে এবং বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করবে। ফ্রান্সের সুরে সুর মিলিয়ে পোল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, নেদারল্যান্ডস এবং অস্ট্রিয়াও তাদের আপত্তি জানিয়েছে। বেলজিয়াম ভোটদানে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো চুক্তি আটকে দিতে হলে অন্তত চারটি সদস্য রাষ্ট্রকে একজোট হতে হবে, যারা ইইউর মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এই জটিল সমীকরণে বর্তমানে ইতালির অবস্থান 'গেম চেঞ্জার' বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এখনো তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।

 

যদিও তিনি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলের রাজনৈতিক মিত্র, তবুও ইতালির কৃষিমন্ত্রী স্থানীয় কৃষকদের সুরক্ষায় কঠোর শর্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে ইতালির রপ্তানি শিল্পের জন্য মারকোসার বাজার অত্যন্ত লোভনীয় হওয়ায় রোম শেষ পর্যন্ত চুক্তির পক্ষেই রায় দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চুক্তির রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ এখানেই শেষ নয়। আগামী ১৬ ডিসেম্বর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে চুক্তির সুরক্ষামূলক শর্তাবলী নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হবে।

 

সদস্য রাষ্ট্রগুলো অনুমোদন দিলেও চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুসমর্থন প্রয়োজন, যা ২০২৬ সালের আগে সম্ভব নয়। পার্লামেন্টের কট্টর ডান ও বামপন্থী দলগুলো ইতিমধ্যেই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ব্রাসেলসের নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলছেন, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের এই সময়ে মারকোসার চুক্তি ভেস্তে গেলে তা হবে ইউরোপের জন্য এক বিশাল কৌশলগত ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা।

 

এটি ইউরোপের বাণিজ্যিক অংশীদার বৈচিত্র্যকরণের উচ্চাভিলাষকেও ধুলিসাৎ করবে। অন্যদিকে, দীর্ঘ অপেক্ষায় ধৈর্যহারা দক্ষিণ আমেরিকার একজন শীর্ষ কূটনীতিক ইউরোনিউজকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এবার চুক্তি না হলে তাঁরা এই উদ্যোগকে "কংক্রিট দিয়ে কবর দিতে" প্রস্তুত। আগামী দশ দিনই নির্ধারণ করবে ২৫ বছরের এই প্রচেষ্টার ফলাফল-সাফল্যের হাসি নাকি রাজনৈতিক অদক্ষতার গ্লানি।

 

- Euro News