শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু করে রোববার সকাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়া অবশিষ্ট তিনটি গ্রুপের চূড়ান্ত ও রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নকআউট পর্বের বত্রিশটি দলের তালিকা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়েছে।
শেষ ষোলো বা পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার জন্য বাকি ছিল মাত্র চারটি শূন্যস্থান, যা চূড়ান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এবারের বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্বের সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। ইতিমধ্যে নকআউট পর্বে কোন দল কার মুখোমুখি হবে, সেটিও সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে, যার ফলে ফুটবল ভক্তদের মাঝে নতুন করে উন্মাদনা শুরু হয়েছে।
বিশ্বকাপের 'এল' গ্রুপের লড়াইয়ে মাঠে নামার আগেই ফেভারিট ইংল্যান্ড অন্তত তৃতীয় দল হিসেবে নিজেদের শেষ বত্রিশের টিকিট নিশ্চিত করে রেখেছিল। তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যে তারা আগেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়া পানামার বিপক্ষে মাঠে নামে।
শনিবার দিবাগত রাতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ইংলিশরা অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে খেলে দুই-শূন্য গোলের সহজ জয় তুলে নেয়। ইংল্যান্ডের পক্ষে দর্শনীয় গোল দুটি করেন দলের অন্যতম সেরা তারকা জুড বেলিংহ্যাম এবং অধিনায়ক হ্যারি কেইন।
একই সময়ে অনুষ্ঠিত এই গ্রুপের অপর একটি বাঁচা-মরা ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া এবং আফ্রিকার শক্তিশালী দল ঘানা। ঘানা আগে থেকেই একটি জয় এবং একটি ড্রয়ের সুবাদে চার পয়েন্ট নিয়ে নকআউট পর্বে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে রেখেছিল।
তবে ক্রোয়েশিয়ার জন্য এই ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই ম্যাচে ঘানাকে দুই-এক গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে গ্রুপের পয়েন্ট তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ক্রোয়াটরা শেষ বত্রিশে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে।
এই জয়ের ফলে ক্রোয়েশিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ছয় পয়েন্টে। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ সাত পয়েন্ট নিয়ে ইংল্যান্ড গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং চার পয়েন্ট নিয়ে ঘানা তৃতীয় স্থান অধিকার করে।
'এল' গ্রুপের খেলা শেষ হওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পর মাঠে গড়ায় 'কে' গ্রুপের চারটি দলের লড়াই। এই গ্রুপ থেকে আগেই শক্তিশালী কলম্বিয়া এবং পর্তুগাল নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে রেখেছিল। ফলে তাদের মধ্যকার ম্যাচটি মূলত গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়।
দুই ফুটবল পরাশক্তির এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। গোলশূন্য ড্রয়ের মাধ্যমে শেষ হওয়া এই ম্যাচের পর সাত পয়েন্ট নিয়ে কলম্বিয়া 'কে' গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে পর্তুগাল রানার্সআপ হিসেবে নকআউট পর্বে পা রাখে।
একই গ্রুপের অপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে উজবেকিস্তানকে দুই-এক গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে গণতান্ত্রিক কঙ্গো। এই অভাবনীয় জয়ের মাধ্যমে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করে, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।
এদিকে, 'কে' গ্রুপের ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার সুযোগ ছিল আর মাত্র দুটি দলের। তবে সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের বিশেষ নজর ছিল এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি ইরানের দিকে, যারা আগেই নিজেদের গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ করে সমীকরণের অপেক্ষায় ছিল।
আলজেরিয়া এবং অস্ট্রিয়ার মধ্যকার ম্যাচে যেকোনো এক দল জয়লাভ করলেই মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি নকআউট পর্বে উঠে যেত। কিন্তু ইরানকে চরম হতাশার সাগরে ডুবিয়ে আলজেরিয়া এবং অস্ট্রিয়া এক মহানাটকীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে তিন-তিন গোলে ড্র করে।
এই ড্রয়ের ফলে উভয় দলই সমান চার পয়েন্ট অর্জন করে এবং সমীকরণের সুবিধা নিয়ে নকআউট পর্বে নিজেদের জায়গা করে নেয়, যার ফলে ইরানের অপ্রত্যাশিত বিদায় ঘণ্টা বেজে যায়। একই গ্রুপ থেকে আগেই চ্যাম্পিয়ন হওয়া শক্তিশালী আর্জেন্টিনা তাদের শেষ ম্যাচে জর্ডানকে তিন-এক গোলের ব্যবধানে অনায়াসে পরাজিত করে নকআউটের আগে নিজেদের শতভাগ জয় নিশ্চিত করে।
যদিও এই ম্যাচের ফলাফল অন্য কোনো দলের সমীকরণে কোনো প্রভাব ফেলেনি। গ্রুপ পর্বের এই দীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল লড়াই শেষে নকআউট পর্বে উত্তীর্ণ বত্রিশটি দলের তালিকা সম্পূর্ণ হয়েছে।
বিভিন্ন গ্রুপের শীর্ষ দুই দল এবং তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলোর হিসেবে যারা নকআউট পর্বে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে, তারা হলো- মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, ব্রাজিল, মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, প্যারাগুয়ে, জার্মানি, আইভরি কোস্ট, ইকুয়েডর, নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন, বেলজিয়াম, মিশর, স্পেন, কেপ ভার্দে, ফ্রান্স, নরওয়ে, সেনেগাল, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া, কলম্বিয়া, পর্তুগাল, গণতান্ত্রিক কঙ্গো, ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া এবং ঘানা।
অন্যদিকে, এবারের বিশ্বকাপের স্বপ্ন ভেঙে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে বেশ কয়েকটি পরিচিত এবং শক্তিশালী দলকে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর বিদায়ীদের এই দীর্ঘ তালিকায় নাম লিখিয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র, কাতার, হাইতি, তুরস্ক, কুরাসাও, তিউনিসিয়া, নিউজিল্যান্ড, উরুগুয়ে, সৌদি আরব, ইরাক, জর্ডান, পানামা, ইরান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো।
স্বপ্নভঙ্গের তীব্র বেদনা নিয়ে তাদের এবার দেশে ফিরে যেতে হচ্ছে। এখন সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের নজর নকআউট পর্বের রোমাঞ্চকর ম্যাচগুলোর দিকে, যেখানে একটি মাত্র ভুল মানেই টুর্নামেন্ট থেকে চিরবিদায়।