বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল পরাশক্তির প্রতি এ দেশের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা কার্যত ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা দল।
ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত হলেও, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, খোদ আর্জেন্টিনার পর সম্ভবত বাংলাদেশেই এই দলটির সবচেয়ে বেশি এবং একনিষ্ঠ সমর্থক বসবাস করেন।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় প্রসারের ফলে বাংলাদেশি সমর্থকদের এই বাঁধভাঙা ফুটবল উন্মাদনার খবর আজ আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর কল্যাণে তা পৌঁছে গেছে বিশ্ববাসীর দরবারে।
এমনকি সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা দলের অন্যান্য খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারাও এখন এই অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা অত্যন্ত ভালোভাবে অবগত।
চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নিজেদের অনবদ্য ও নান্দনিক পারফরম্যান্স অব্যাহত রেখে ইতোমধ্যে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে মাঠে নেমে নিজেদের শেষ ম্যাচে জর্ডানকে তিন-এক গোলের সুস্পষ্ট ব্যবধানে পরাজিত করে গ্রুপ পর্বে সম্পূর্ণ অপরাজিত থাকার গৌরব অর্জন করেছে দলটি।
এই স্মরণীয় জয়ের পর স্টেডিয়ামের মিক্সড জোনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন দলের অন্যতম আস্থার প্রতীক এবং বিশ্বকাপজয়ী তারকা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। বিশ্ব গণমাধ্যমের বিপুল উপস্থিতিতে সেখানে যখন তার কাছে হাজার মাইল দূরের দেশ বাংলাদেশ এবং সেখানকার অগণিত ফুটবল ভক্তদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়, তখন তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও আন্তরিকভাবে নিজের মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করেন।
তার কণ্ঠে স্পষ্টভাবে ঝরে পড়ে এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং অসীম কৃতজ্ঞতা। বাংলাদেশের আবেগপ্রবণ ও ফুটবলপাগল ভক্তদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পাশাপাশি এমিলিয়ানো মার্টিনেজ তার বিগত বাংলাদেশ সফরের স্মৃতিচারণ করেন।
এ দেশের মানুষের আর্জেন্টিনা দলের প্রতি নিঃশর্ত, অকুণ্ঠ ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করে এই বিশ্বখ্যাত তারকা ফুটবলার গণমাধ্যমকে বলেন যে, তিনি বাংলাদেশের সমর্থকদের গভীরভাবে ভালোবাসেন এবং এই অপরূপ দেশটির প্রতিও তার বিশেষ টান রয়েছে।
তিনি আরও যুক্ত করে বলেন, এই দেশের মানুষ আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের জন্য ঠিক কতটা পাগল ও নিবেদিতপ্রাণ, তা তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে স্বচক্ষে দেখেছেন। সেখানে যাওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে মন্তব্য করেন যে, তার মনে হয়, কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের এই মানুষগুলো হৃদয়ের দিক থেকে সবাই একেকজন খাঁটি আর্জেন্টাইন।
তার এই আন্তরিক বক্তব্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশি সমর্থকদের নিখাদ ভালোবাসা তার হৃদয়কে কতটা গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে আয়োজিত বিশ্বকাপে বহুল কাঙ্ক্ষিত শিরোপা জয়ের প্রায় এক বছর পর, একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ সফরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এসেছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
সেই সময় সীমিত পরিসরে ও অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মাঝেও এ দেশের সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে ঘিরে যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও আনন্দ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা তার মনে এক স্থায়ী ও ইতিবাচক ছাপ ফেলে যায়।
তবে কেবল মার্টিনেজই নন, এর আগে কাতার বিশ্বকাপ চলাকালেও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আবেগময় কথা বলেছিলেন আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের সফল প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি।
সে সময় বিশ্ব গণমাধ্যমের সামনে তিনিও বাংলাদেশি সমর্থকদের অকুণ্ঠ সমর্থনের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং এই বিপুল সমর্থন তাদের ভালো খেলার পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে বলে স্বীকার করেছিলেন।
খেলাধুলা যে ভাষা, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক দূরত্বের সব অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তের মানুষকে একটি অভিন্ন আবেগের সুতোয় বেঁধে ফেলতে পারে, আর্জেন্টিনা ফুটবল দল এবং বাংলাদেশি সমর্থকদের মধ্যকার এই আত্মিক সম্পর্ক তারই এক উজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
এমিলিয়ানো মার্টিনেজের এই সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে আবারও প্রমাণ করল যে, বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম এখন আর অজানা বা অপরিচিত কোনো শব্দ নয়, বরং তা এক নিঃস্বার্থ ও আবেগময় ফুটবল প্রেমের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধন আগামী দিনগুলোতেও অটুট থাকবে বলে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন।