আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সমঝোতার অংশ হিসেবে দুই দেশ একটি ১৪ দফার খসড়া চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি হয়েছে। আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ নামের এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে এই নতুন চুক্তির খসড়াটি পাঠিয়েছিল ওয়াশিংটন। এই খসড়া পাঠানোর পর মার্কিন ও ইরানি পক্ষকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নিয়ে আসতে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে মধ্যস্থতাকারী দুই দেশ পাকিস্তান ও কাতার।
দুই দেশের নিবিড় ও দীর্ঘস্থায়ী প্রচেষ্টার ফলেই প্রায় দেড় মাস পর ইরান এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরে আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রদান করেছে। প্রস্তাবিত এই চুক্তির খসড়ার মূল বিষয়বস্তু বা দাপ্তরিক অনুলিপি এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন কিংবা তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। ফলে খসড়ায় থাকা ১৪টি দফার বিস্তারিত এবং স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক কর্মকর্তা এবং মধ্যস্থতাকারীদের সূত্রে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি এই খসড়া চুক্তির সম্ভাব্য মূল শর্তগুলো সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য ধারণা লাভ করেছে।
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথে দুই দেশের মধ্যে চলমান যাবতীয় সামরিক হামলা ও সহিংসতা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। একই সাথে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
এর বিপরীতে ইরানের বিভিন্ন বন্দরের ওপর দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া হবে এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ অবমুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এই খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির রূপরেখা প্রণয়নের জন্য ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে না।
পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির ওপর বহাল থাকা পূর্বের কঠোর বিধিনিষেধগুলো সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হবে, যা ইরানের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এর বিনিময়ে ইরানকে অবশ্যই তাদের বিতর্কিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং একই সঙ্গে পরমাণু প্রকল্প সংক্রান্ত সব ধরনের স্থাপনার সম্প্রসারণ কাজ স্থগিত রাখতে হবে।
৬০ দিনের এই আলোচনা চলাকালে ইরানের বর্তমান ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে দুই পক্ষ বিস্তারিত আলোচনা করবে এবং এ বিষয়ে একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।
চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসনে উভয় দেশ প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। চলমান যুদ্ধের কারণে ইরানের যে ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন সংক্রান্ত জটিল বিষয়েও এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হবে।
চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির খসড়া প্রস্তুতের পাশাপাশি এই স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পুনর্গঠন সহায়তা এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র বহুপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।