দুই দেশের মধ্যে এই ঐতিহাসিক সমঝোতার বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি এই দেড় পৃষ্ঠার প্রাথমিক চুক্তিটিকে একটি অনন্য দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারাও এই চুক্তির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেভায় এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে এবং একই দিনে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের একটি বিশেষ অধিবেশনে ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনার সময় এই তথ্য প্রকাশ্যে আসে। ওই অধিবেশনে মিশর, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সাথে এক আলাপচারিতায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, সমঝোতার সকল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে এর সফল সমাপ্তি ঘোষণা করছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্বাক্ষর করেছেন।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা জব্দ করা অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে তেহরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স জানান, এই সমঝোতা স্মারক মূলত একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করেছে। ভবিষ্যৎ আলোচনার মাধ্যমে এর খুঁটিনাটি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হবে।
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি যেকোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে অর্থায়ন বন্ধ করার বিষয়ে ইরানের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরান একটি যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে।
এই চুক্তির ফলে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ষাট দিন বৃদ্ধি পাবে এবং এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা নিয়ে বিশদ আলোচনা করবে। এই সমঝোতায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের দাবি করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
তিনি জানিয়েছেন, চুক্তির শর্তাবলির মধ্যে লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা লেবাননকে এই যুদ্ধবিরতির কাঠামোর আওতায় রাখার কথা স্বীকার করলেও জানিয়েছেন যে, সেখান থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো শর্ত চুক্তিতে নেই এবং ইসরায়েল তার আত্মরক্ষার অধিকার সম্পূর্ণভাবে বজায় রাখবে।
এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে, তাদের বাহিনী প্রয়োজন অনুযায়ী লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় অবস্থান করবে। যেকোনো হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েলের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে এবং কোনো চুক্তির অজুহাতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, শান্তি চুক্তির ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইতোমধ্যে তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের টানা দীর্ঘ আলোচনার পর এই প্রাথমিক চুক্তিটি সম্ভব হয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যম একে তাদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরলেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের এখনো গভীর অবিশ্বাস রয়েছে এবং এই চুক্তিকে তারা কেবল উত্তেজনা কমানোর একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করছে।