গত দুই দিন ধরে ওই প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার যে অভিযোগ উঠেছে, তাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূখণ্ডে টানা রাতভর সামরিক বিমান হামলা চালিয়েছে। এই আকস্মিক ও তীব্র সামরিক আগ্রাসনের পর ইরান অত্যন্ত কঠোর এবং সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে।
উদ্ভূত এই সংঘাতময় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে, আগামী অন্তত তিরিশ দিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর নৌপথটি সম্পূর্ণভাবে তেহরানের নিশ্ছিদ্র তত্ত্বাবধান এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
রোববার, আটাশে জুন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা সমগ্র বিশ্বের কূটনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সংবাদমাধ্যমের কাছে দেশের এই বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে জানান যে, তিনি ইতোমধ্যে ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সম্পন্ন করেছেন।
সেই ফোনালাপে তিনি ইরানের ওপর অযাচিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই নতুন সামরিক সংঘাতের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে বাগদাদকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেছেন। এর পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের সর্বশেষ অগ্রগতি এবং বর্তমান অবস্থা নিয়েও তাদের মধ্যে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে, আগামী এক মাস হরমুজ প্রণালির সমগ্র নৌপথটি শুধুমাত্র ইরানের নিজস্ব সামরিক ও কৌশলগত বাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে।
তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, এই নৌপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য সৃষ্ট সকল ধরনের সাময়িক ও কৌশলগত বাধা দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপসারণ করে প্রণালির পূর্ণ ব্যবহারিক সক্ষমতা পুনরায় ফিরিয়ে আনা হবে এবং বর্তমানে তেহরান সেই লক্ষ্যেই অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির রক্ষণাবেক্ষণ এবং এর নিরাপত্তার বিষয়ে ইরানের নিরঙ্কুশ অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আব্বাস আরাঘচি বলেন, এই আন্তর্জাতিক জলপথের সার্বিক নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের সম্পূর্ণ দায়ভার এককভাবে কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্য কোনো পরাশক্তি, দেশ বা আন্তর্জাতিক পক্ষের বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা কিংবা হস্তক্ষেপ করার কোনো আইনি অধিকার নেই। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন ধারার অধীনে এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুতরাং, এখানে যেকোনো বিদেশি শক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বা একতরফা সামরিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে এবং পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করবে।
এমন কোনো অযাচিত পরিস্থিতির উদ্ভব হলে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিটি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, উদ্ভূত এই উত্তেজনাকর সামরিক পরিস্থিতিতে নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসি।
এক আনুষ্ঠানিক ও কড়া বিবৃতির মাধ্যমে আইআরজিসি সরাসরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে যে, তাদের নিজস্ব জলসীমা ও সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো ধরনের অন্যায্য সামরিক আগ্রাসন বা আক্রমণের অত্যন্ত ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে।
আইআরজিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেই চুক্তির সুস্পষ্ট শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের গতিবিধি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করার নিরঙ্কুশ দায়িত্ব তেহরানকে অর্পণ করা হয়েছে।
তাই এখন থেকে এই অঞ্চলে নৌ চলাচলের নির্ধারিত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নিয়ম কানুন লঙ্ঘনকারী যেকোনো দেশের জাহাজের বিরুদ্ধে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও অনেক বেশি কঠোর, আগ্রাসী এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনি ও সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইআরজিসির ওই দীর্ঘ বিবৃতিতে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, গত কয়েক দিনে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে ধরনের একতরফা বিমান হামলা চালিয়েছে, তা সম্পূর্ণ উসকানিমূলক।
এমন কোনো ঠুনকো অজুহাতে শত্রুপক্ষ যদি ভবিষ্যতে আবারও কোনো সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে ইরান তার সর্বশক্তি দিয়ে তার মোক্ষম ও দাঁতভাঙা জবাব দিতে এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ করবে না।
তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, যেকোনো ধরনের একতরফা সামরিক হামলা বা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের পরিপন্থি একটি কাজ। যদি এই ধরনের আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তবে সমঝোতা স্মারকের অধীনে চলমান সব ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরিভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে এবং বন্ধ হয়ে যাবে।
এই তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো হরমুজ প্রণালি এবং এর আশপাশের একাধিক কৌশলগত অবস্থানে সফলভাবে হামলা পরিচালনা করেছে।
নিজেদের এই সামরিক অভিযানের সপক্ষে সেন্টকম একটি ভিডিও চিত্রও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছে, যদিও ওই ভিডিওটিতে রাতের অন্ধকারে চালানো হামলার বেশ কিছু অস্পষ্ট ও ঝাপসা দৃশ্যই কেবল পরিলক্ষিত হয়েছে।
অন্যদিকে, আইআরজিসি মার্কিন এই দাবির জবাবে তাদের নিজস্ব বিবৃতি দিয়ে নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সর্বশেষ দফার এই আগ্রাসী বিমান হামলায় ইরানের অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় সামরিক অবস্থানকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এই দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যে চলমান এই নতুন সংঘাত আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সারা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন।