এই অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক অভিযানটি ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির এক চরম, নগ্ন এবং সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বিশ্ব দরবারে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক স্থিতিশীলতা আবারও এক গভীর হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
রোববার, আটাশে জুন, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক অত্যন্ত কঠোর এবং আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে মার্কিন বাহিনীর এই একতরফা ও আগ্রাসী পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে।
তেহরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে চালানো মার্কিন বাহিনীর এই নতুন সামরিক পদক্ষেপকে অত্যন্ত বর্বর, নৃশংস এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
একটি কার্যকর সমঝোতা স্মারক বলবৎ থাকা সত্ত্বেও বিনা প্ররোচনায় এমন সামরিক অভিযানকে ইরান তাদের জাতীয় নিরাপত্তা, ভূখণ্ড এবং সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি ও সুপরিকল্পিত আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা ওই আনুষ্ঠানিক ও সুদীর্ঘ বিবৃতিতে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বোমাবর্ষণের ঘটনাটি বিশ্ববাসীর সামনে আবারও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন নিজেদের দেওয়া কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা দাপ্তরিক অঙ্গীকারের বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন করে না।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে যেকোনো শান্তি চুক্তি, দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা বা প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের যে চরম অনীহা এবং উদাসীনতা রয়েছে, তা এই বর্বরোচিত হামলার মাধ্যমে আরও একবার নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে বলে তেহরান জোরালো দাবি করেছে।
ওই বিবৃতিতে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বলা হয়, অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে একটি চুক্তি সম্পন্ন করার পর তা মাঝপথে অযৌক্তিকভাবে ভেঙে ফেলা এবং নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে একতরফাভাবে সরে আসা মূলত বর্তমান মার্কিন শাসন ব্যবস্থার একটি মজ্জাগত ও স্বাভাবিক চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে।
তেহরানের মতে, এই ধরনের অবিবেচক ও দায়িত্বহীন আচরণের ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার চূড়ান্ত সংকট তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব শান্তির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অনাকাঙ্ক্ষিত এবং উসকানিমূলক সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরান সরকার যেকোনো মূল্যে তাদের নিজস্ব জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সম্পূর্ণভাবে বদ্ধপরিকর।
তেহরান অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এবং শক্ত অবস্থানে থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের নিজস্ব পবিত্র ভূখণ্ড কিংবা কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানিসীমার ওপর কোনো ধরনের অন্যায্য হস্তক্ষেপ, আগ্রাসন বা আধিপত্য বিস্তারের নগ্ন চেষ্টা তারা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেবে না।
শত্রুর যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ, সামরিক আস্ফালন অথবা আগ্রাসী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী এবং প্রতিরক্ষা কাঠামোগুলো নিজেদের ভূখণ্ড ও উপকূলীয় জলসীমা নিশ্ছিদ্র সুরক্ষায় সর্বোচ্চ স্তরের এবং অভাবনীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
দেশের মাটি, আকাশসীমা ও পানিসীমার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রশ্নে তেহরান যে বিন্দুমাত্র আপস করবে না, তা এই বিবৃতির পরতে পরতে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সুপরিচিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর একটি বিশেষ এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এই সংবাদের সত্যতা, গভীরতা ও বিস্তারিত তথ্য সারা বিশ্বের সামনে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা বিমান হামলার ফলে ঐ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির যে ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
একটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত এবং দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকে নির্ধারিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি চরম ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ অবজ্ঞা প্রদর্শন করে চালানো এই আকস্মিক বিমান হামলা শুধুমাত্র দুটি দেশের মধ্যকার চরম বৈরী সম্পর্ককেই নতুন করে খাদের কিনারে নিয়ে যায়নি, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক ভয়াবহ এবং দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি চরমভাবে লঙ্ঘন করে এ ধরনের একতরফা এবং আগ্রাসী সামরিক শক্তি প্রয়োগের নেতিবাচক পরিণতি আগামী দিনে ওই অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক ও অমোচনীয় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ইরান সরকার এখন তাদের পরবর্তী কৌশলগত সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নির্ধারণে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জরুরি সতর্কতা অবলম্বন করে নিরবচ্ছিন্ন পর্যালোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক চিত্র।