শনিবার, জুন ২৭, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঐতিহাসিক ইব্রাহিম মসজিদে টানা পাঁচ দিন আজান বন্ধ রাখল ইসরায়েলি বাহিনী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

ঐতিহাসিক ইব্রাহিম মসজিদে টানা পাঁচ দিন আজান বন্ধ রাখল ইসরায়েলি বাহিনী
ছবি : Collected

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিমতীরের হেবরন শহরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদে টানা পাঁচ দিন ধরে আজান প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সমাধিস্থল হিসেবে পরিচিত এই পবিত্র স্থানটিতে দীর্ঘ সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার ও ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে, আর আজান বন্ধের এই সর্বশেষ পদক্ষেপ সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডেল ইস্ট আইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার থেকে মসজিদের মুয়াজ্জিনকে আজান দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। স্থানীয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইসরায়েলি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মুয়াজ্জিন আজান প্রদানের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাতে পারছেন না, ফলে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে দীর্ঘদিনের প্রচলিত আজানের ধ্বনি প্রচার করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

এই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মসজিদটির পরিচালনা পর্ষদের প্রধান শেখ মুতাজ আবু সেনিনেহ এবং কাস্টাডিয়ান প্রধান হাম্মাম আবু মুরখিয়াকে আগামী ১২ দিনের জন্য সেখানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

 

ইব্রাহিমি মসজিদের ধর্মীয় ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের এমন আকস্মিক ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।

 

ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, মসজিদ প্রাঙ্গণে চলমান কিছু সংস্কার কাজ এবং খোলা অংশে ছাদ নির্মাণের কারণেই নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে আজান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ফিলিস্তিনি প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মকর্তারা এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মসজিদে সাধারণ মুসল্লিদের প্রবেশের অনুমতি থাকলেও সুপরিকল্পিতভাবে আজানের জায়গাটিতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা সরাসরি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল।

 

ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের দিক থেকে ইব্রাহিমি মসজিদ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, তবে ১৯৯৪ সালের ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে এর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সম্পূর্ণ বদলে যায়। সে বছর একজন আমেরিকান-ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী মসজিদে ঢুকে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত করে, যাতে ২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন।

 

সেই নৃশংস ঘটনার পর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মসজিদটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে, যার ৬০ শতাংশ ইহুদিদের জন্য এবং বাকি ৪০ শতাংশ মুসলিমদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েল সেই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে থাকে এবং নিয়মিত ব্যবধানে ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের ধর্মীয় অনুশীলনে বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ধর্মীয় স্থাপনার ওপর এই ধরনের বিধিনিষেধ মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এটি ওই অঞ্চলের মুসলিম জনবসতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপের একটি কৌশল।

 

আজান বন্ধ রাখার ঘটনাটি কেবল একটি ধর্মীয় প্রথা থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর এক ধরনের বড় আঘাত। ইসরায়েলের এই কঠোর অবস্থান পশ্চিমতীরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

বর্তমানে হেবরন শহরের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং ধর্মীয় এই স্থাপনা ঘিরে ইসরায়েলি বাহিনীর এমন দমনমূলক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

 

ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সব ধর্মের মানুষের নিরবচ্ছিন্ন অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হলেও, ইব্রাহিমি মসজিদে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত আজান প্রচার ও স্বাভাবিক ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

 

- মিডেল ইস্ট আই