রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবতার প্রতি শত্রুতা যুক্তরাষ্ট্রের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য, ইরানের প্রধান বিচারপতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

মানবতার প্রতি শত্রুতা যুক্তরাষ্ট্রের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য, ইরানের প্রধান বিচারপতি
ছবি : Collected

বিশ্ব রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই।

 

রোববার এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় তিনি মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান নীতি-নির্ধারণী কাঠামো এবং তাদের মানবাধিকার সংক্রান্ত দাবিগুলোকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে এই মন্তব্য করেন। ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি দাবি করেছেন যে, মানবতার প্রতি শত্রুতা পোষণ করা এবং তা বাস্তবায়ন করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি মজ্জাগত ও স্বভাবজাত অংশ।

 

তিনি পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান মার্কিন নেতৃত্বের মধ্যে মানবতার প্রতি যে চরম বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা বিদ্যমান, তা বিশ্বশান্তির জন্য একটি বড় হুমকি। সেই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা করার যে দাবি করা হয়, সেটিকে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি চরম “হাস্যকর” বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেইর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ধরন কেবল সরাসরি সামরিক আক্রমণ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি অভিযোগ করেন যে, ওয়াশিংটন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং মিডিয়াকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

 

তার ভাষ্যমতে, মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাস্তবতাকে বিকৃত করার ক্ষেত্রে পারদর্শী এবং তারা সুকৌশলে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বজনমতকে নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করে।

 

নিজেদের যেকোনো অনৈতিক বা বেআইনি কর্মকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে তারা সর্বদা মিডিয়া যুদ্ধের আশ্রয় নেয়, যা বিশ্বব্যাপী প্রকৃত সত্যকে আড়াল করার একটি হীন কৌশল বলে তিনি মনে করেন।

 

নিজস্ব বিচার ব্যবস্থার অবস্থান থেকে ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অপরাধ ও অন্যায্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বর্তমানে ইরানের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

 

এখন পর্যন্ত যা যা তথ্যপ্রমাণ ও নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বিশ্ব আদালতে এগুলোকে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, কেবল কথায় নয়, বরং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায়গুলোর বিচার চাইতে বদ্ধপরিকর।

 

ইরানের প্রধান বিচারপতি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামরিক অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং জনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকাগুলোতে মার্কিন বোমাবর্ষণকে তিনি সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তার দাবি, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন বা জেনেভা কনভেনশনের তোয়াক্কা না করে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালানো মার্কিন প্রশাসনের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তিনি এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

 

আলোচনার এক পর্যায়ে গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের কর্মকাণ্ড ও তার দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন যে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বা সাফল্য অর্জনের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখিয়েছিলেন, তা মূলত তার একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল।

 

তেহরানের দৃঢ় প্রতিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ সংহতির কারণে ট্রাম্পের সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ইরানের প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তেহরানের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ এবং তাদের একতরফা আগ্রাসন মোকাবিলার মানসিক দৃঢ়তাই ফুটে উঠেছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতির এই কঠোর হুঁশিয়ারি আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

- প্রেস টিভি