এই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী দেশ ইরান থেকে অপেক্ষাকৃত সস্তায় জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে পাকিস্তান।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার অংশ হিসেবে এমন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির সরকার।
রোববার পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোরে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেশটির কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক সরকারের এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিশদভাবে তুলে ধরে পাকিস্তানের এই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানান, গত এপ্রিলে যখন দুই দেশের মধ্যকার সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
এর একটি সরাসরি ও ভয়াবহ প্রভাব পড়ে পাকিস্তানের স্থানীয় জ্বালানি বাজারে। ওই চরম সংকটময় সময়ে দেশটিতে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে প্রতি লিটার ৪৬০ পাকিস্তানি রুপিতে গিয়ে ঠেকেছিল, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।
তবে, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাতের অবসানের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে, যা পাকিস্তানের মতো সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য একটি অত্যন্ত বড় ও স্বস্তিদায়ক খবর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রশংসনীয়। গত ১৭ জুন সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তান একটি অত্যন্ত সফল, নিরপেক্ষ ও কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
এই চুক্তির শর্তগুলো পাকিস্তানের নিজস্ব জ্বালানি খাতের ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত ইতিবাচক। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরিভাবে প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত একটি বিশেষ অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা চালু থাকবে।
এর মাধ্যমে ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং এর উপজাতগুলো রপ্তানির ক্ষেত্রে মার্কিন অর্থ দপ্তরের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করা হবে।
একই সঙ্গে এর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংকিং লেনদেন, আন্তর্জাতিক বিমা সুবিধা এবং সামুদ্রিক পরিবহনসহ সব ধরনের আনুষঙ্গিক পরিষেবার ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা মূলত পাকিস্তানের জন্য ইরান থেকে সরাসরি জ্বালানি আমদানির পথকে পুরোপুরি প্রশস্ত করেছে।
তেলের দাম কমার সুফল দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে আলী পারভেজ মালিক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এর সুফল দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন, ভোক্তাদের বর্তমানে যে পরিমাণ আর্থিক স্বস্তি দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমার হারের চেয়েও আনুপাতিকভাবে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে রাষ্ট্র যেটুকু আর্থিক সুবিধা পেয়েছে, সরকার তার চেয়েও বেশি সুবিধা দেশের সাধারণ জনগণকে ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করেছে বলে তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।
সরকার ইতোমধ্যে পেট্রল ও ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়েছে। দেশের প্রতিটি নাগরিককে বিগত দিনগুলোতে একটি অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, স্রষ্টার অশেষ রহমতে সেই অন্ধকার ও কঠিন সময় কেটে গেছে এবং আগামী দিনগুলোতে পাকিস্তানের জন্য আরও সমৃদ্ধ ও ভালো সময় অপেক্ষা করছে।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের কড়া সমালোচনা করেন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী। একটি নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক গোষ্ঠী সাধারণ জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত করার হীন উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে তিনি সব ধরনের অভিযোগ শক্তভাবে নাকচ করে দেন।
জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর বর্তমান অবস্থান বিষয়ে মন্ত্রী জানান, তাদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি বা লিখিত অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের হস্তগত হয়নি। তবে কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে নিজেদের কিছু ব্যবসায়িক উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন এবং সরকার অত্যন্ত মনোযোগ ও সহানুভূতির সঙ্গে তাদের সেই যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনা করছে।
দেশের সার্বিক শিল্প খাতে স্বচ্ছতা আনয়ন এবং ফেডারেল বোর্ড অব রেভিনিউয়ের (এফবিআর) উদ্বেগ দূর করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বিভিন্ন গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মন্ত্রী দৃষ্টান্ত দিয়ে জানান, তিনি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের আওতাধীন টেক্সটাইল মিলগুলোতে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য উন্নত প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করেছেন।
একই ধারাবাহিকতায় এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধের স্বার্থে দেশের সকল তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতেও এ ধরনের অত্যাধুনিক ক্যামেরা বসানোর জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট মালিকদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
পরিশেষে, দেশে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত থাকা আরএলএনজি (রিগ্যাসিফায়েড লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) সংযোগগুলো খুব শিগগিরই পুনরায় চালু করা হবে বলেও তিনি এই সংবাদ সম্মেলনে এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘোষণা প্রদান করেন।