দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সামুদ্রিক পথটির ব্যবস্থাপনায় বাইরের কোনো শক্তি নাক গলালে উদ্ভূত পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের এই পথটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার যে প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে, তা মারাত্মকভাবে বিলম্বিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের রাজধানী বাগদাদে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসাইনের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আব্বাস আরাগচি এসব কথা বলেন।
বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ইরানের নিজস্ব সামুদ্রিক সীমানা ও নৌপথ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত যেকোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই বাহ্যিক চাপ বা অযাচিত সামরিক হস্তক্ষেপের অধীন হতে পারে না।
যদি আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক কোনো শক্তিশালী পক্ষ নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এই প্রণালির ওপর নতুন কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বা নিয়ন্ত্রণকাঠামো জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়, তবে তা বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের বদলে সংকটকেই কেবল আরও দীর্ঘায়িত করবে।
ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিকের জন্য বাগদাদের বর্তমান সফরটি নানা দিক থেকেই অত্যন্ত বিশেষ, তাৎপর্যপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। প্রাপ্ত তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের যে আগ্রাসী সামরিক হামলা পরিচালিত হয়েছে, তার পর ইরাকে এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর।
এই চরম কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে ইরানের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ানো এবং ওই আগ্রাসী সামরিক হামলার বিরুদ্ধে তীব্র রাষ্ট্রীয় নিন্দা জ্ঞাপন করার জন্য তিনি ইরাকের সরকার ও সে দেশের সাধারণ জনগণের প্রতি গভীর সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান যে, এক অকৃত্রিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ইরাকের এই জোরালো ও সাহসী সমর্থন ইরান সবসময় অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে স্মরণ রাখবে। আব্বাস আরাগচি তার এই ঐতিহাসিক বাগদাদ সফরের পেছনে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট ও প্রধান উদ্দেশ্যের কথা উপস্থিত গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
প্রথমত, জাতীয় সংকটময় মুহূর্তে নিঃশর্তভাবে পাশে থাকার জন্য ইরাকি বন্ধু ও ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি আনুষ্ঠানিক ও ঐকান্তিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। দ্বিতীয়ত, ইরাকের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করা নবগঠিত সরকারকে অভিনন্দন ও আগামী দিনের জন্য শুভকামনা জানানো।
এবং তৃতীয়ত, যা অত্যন্ত আবেগপূর্ণ, সেটি হলো-ইরানের সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য এবং জানাজা অনুষ্ঠানের সার্বিক প্রস্তুতি ও সমন্বয় করা। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ, কারবালা, সামাররা এবং কাজিমিয়ায় অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে এই বিশাল আয়োজনগুলো সম্পন্ন করার বিষয়ে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
যৌথ এই সংবাদ সম্মেলনে কেবল দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয়ই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়। আরাগচি তার ইরাকি সমকক্ষকে হরমুজ প্রণালির বর্তমান নৌ-পরিস্থিতি এবং লেবাননের চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন।
তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করে ঘোষণা করেন যে, একটি কার্যকর পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে আগামী ত্রিশ দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি তার সংকটপূর্ব স্বাভাবিক, নিরবচ্ছিন্ন ও শান্তিপূর্ণ অবস্থায় ফিরে আসবে।
তবে তিনি শর্তহীনভাবে এটিও অত্যন্ত পরিষ্কার করে জানিয়ে দেন যে, এই প্রণালির সার্বিক ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের পুরো দায়িত্ব এককভাবে কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের হাতেই ন্যস্ত থাকবে।
এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়ে বিশ্বের অন্য কোনো পরাশক্তি, দেশ, সামরিক জোট বা আন্তর্জাতিক সংস্থার বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করার কোনো আইনি, ভৌগোলিক বা নৈতিক কর্তৃত্ব নেই বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দেন।
বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা সচল রাখার পাশাপাশি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখার কথা বলেন।
আরাগচি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই বহিরাগত পরাশক্তি বর্জিত একটি সম্পূর্ণ নতুন ও স্বাধীন কাঠামোর প্রয়োজন।
এই বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তে পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ইরান ও ইরাককে সরাসরি যুক্ত করে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপ শুরু করার যে যুগান্তকারী প্রস্তাব ইরাকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তেহরান তাকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায় এবং এই উদ্যোগের সফলতায় সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।