রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা দিলে ইরানে সামরিক হামলার মার্কিন হুঁশিয়ারি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম

হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা দিলে ইরানে সামরিক হামলার মার্কিন হুঁশিয়ারি
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত জটিল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা এক নতুন এবং উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

 

এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই তেহরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর, সুনির্দিষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে মার্কিন প্রশাসন। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি ও বিশেষ দূত মাইক ওয়াল্টজ অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, হয়রানি বা যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা প্রদান অব্যাহত রাখে, তবে ওয়াশিংটন কেবল নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে না।

 

সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ রাখার স্বার্থে প্রয়োজনে ইরানের ভূখণ্ডে এবং তাদের সামরিক অবকাঠামোর ওপর আরও সুনির্দিষ্ট, শক্তিশালী ও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে বলে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।

 

রোববার মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকারে তিনি এই সংবেদনশীল মন্তব্য করেন, যা বিশ্ব রাজনীতিতে, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। ফক্স নিউজের ওই সাক্ষাৎকারে মার্কিন এই শীর্ষ কূটনীতিক বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের অত্যন্ত আগ্রাসী, দৃঢ় এবং আপসহীন অবস্থানের কথা বিশদভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত কড়া ও আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, ইরান সরকার যদি এক সেকেন্ডের জন্যও এমনটা চিন্তা করে থাকে যে তারা কোনো রকম জুতসই জবাব বা ভয়াবহ পরিণতির শিকার না হয়েই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ এই পথে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো হুমকি তৈরি করতে পারবে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন চরম উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে হাত গুটিয়ে নিশ্চুপ বসে থাকবেন, তাহলে তারা চরম ভুলের মধ্যে রয়েছে।

 

এমন কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার জন্য তেহরানকে অত্যন্ত চড়া ও চরম মূল্য চোকাতে হবে বলে তিনি জোরালোভাবে সতর্ক করেন। হরমুজ প্রণালির মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত জলপথকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাখার হীন উদ্দেশ্যে ইরান যেসব অত্যাধুনিক সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, তার চরম সমালোচনা করেন মাইক ওয়াল্টজ।

 

তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ও দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই প্রাণভোমরা সচল রাখতে এবং ওই জলপথের সার্বিক নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ওই সকল অবৈধ ও উসকানিমূলক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মাত্রার সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।

 

সামরিক হামলার এই কঠোর ও সরাসরি হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার পথও যে একেবারে রুদ্ধ হয়ে যায়নি, মার্কিন দূত তার বক্তব্যে সেই বিষয়টিও অত্যন্ত সুকৌশলে ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে উল্লেখ করেছেন।

 

তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, এই চরম সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে বর্তমানে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কারিগরি বিষয়ক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

 

তবে এই চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ইরানের জন্য একটি অত্যন্ত মূল্যবান সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে মাইক ওয়াল্টজ বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক যেকোনো বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে সবসময়ই কূটনীতিকে সবার আগে একটি ন্যায্য সুযোগ দেওয়ার পক্ষে নিজের অটল অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।

 

কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই কূটনৈতিক ধৈর্য ও সহনশীলতা আজীবন থাকবে না। যদি ইরান এই সদিচ্ছা ও সুযোগের অপব্যবহার করে এবং নিজেদের আগ্রাসী, উসকানিমূলক ও ধ্বংসাত্মক নীতি থেকে দ্রুত সরে না আসে, তবে ওয়াশিংটন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কূটনৈতিক পথ পরিহার করে চূড়ান্ত সামরিক সমাধানের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে।

 

তার এই দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা সীমারেখা নির্ধারণ করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। পরিশেষে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বের মূল কারণ হিসেবে তেহরানের অত্যন্ত বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি আবারও অত্যন্ত শক্তভাবে সামনে নিয়ে আসেন জাতিসংঘে নিযুক্ত এই মার্কিন শীর্ষ দূত।

 

তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিত্রদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এবং তাদের বৈশ্বিক মিত্রদের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র অপরিবর্তনীয় লক্ষ্য হলো ইরানকে কোনোভাবেই একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হতে না দেওয়া।

 

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের যেকোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ করতে ওয়াশিংটন সব ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ, কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক বিকল্প নিজেদের হাতে উন্মুক্ত রেখেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন দূতের এই ধরনের অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরও গভীর মেরুকরণ এবং চরম অস্থিতিশীলতার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

 

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উৎপাদিত মোট জ্বালানি তেলের বিশাল অংশ প্রতিদিন পরিবাহিত হয়, তাই এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর জলপথে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য এক ভয়াবহ ও অকল্পনীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক মহল অত্যন্ত সতর্ক ও উদ্বিগ্ন দৃষ্টি রাখছে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপর।

 

- ফক্স নিউজ