তবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চিরতরে বিনষ্ট হওয়ার চরম শঙ্কা এবং সম্ভাব্য ভয়াবহ ধর্মীয় দাঙ্গার কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সিরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাবে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মূলত সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি বৃহৎ, সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধ বেধে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থেকেই দামেস্ক এই মার্কিন প্রস্তাব অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে নতুন করে কোনো সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি নিতে সিরিয়া বিন্দুমাত্র প্রস্তুত নয়।
শনিবার, সাতাশে জুন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে কাজ করা স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'মিডেল ইস্ট আই'-এর প্রকাশিত একটি বিশেষ ও চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি সারা বিশ্বের সামনে উঠে এসেছে।
ওই বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের সামরিক প্রচেষ্টার পরও লেবাননে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে ইসরায়েল যখন কার্যত চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানে সিরিয়াকে সরাসরি যুক্ত করার বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছেন।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যান্য শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সিরিয়াকে সামরিকভাবে যুক্ত করার এই বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছেন, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া বিভিন্ন প্রকাশ্য বক্তব্য ও মন্তব্য তার নিজস্ব কর্মকর্তাদের ওই আনুষ্ঠানিক দাবির সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থানেরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে।
গত একুশে জুন মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ ও দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে তার চরম হতাশা ও ক্ষোভের কথা অকপটে প্রকাশ করেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় জানান যে, লেবাননের সাধারণ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা ছাড়া হিজবুল্লাহকে সামরিকভাবে পরাস্ত করতে ইসরায়েল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "তারা কেবল লেবাননের পুরো ভবন ধ্বংস করা ছাড়া আর গঠনমূলক বা কার্যকর কিছুই করতে পারে না।
আমি হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার এই বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সিরিয়াকে দেওয়ার একেবারে কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছি।" তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিরিয়াকে ঠিক কী ধরনের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবছেন বা তার রূপরেখা কেমন হবে, তা তিনি সাক্ষাৎকারে সুস্পষ্টভাবে খোলাসা করেননি।
সিরিয়াকে দিয়ে তিনি সরাসরি কোনো সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছেন, নাকি দেশটিকে কোনো রাজনৈতিক মধ্যস্থতার কঠিন দায়িত্ব দিচ্ছেন, নাকি হিজবুল্লাহর ওপর কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কথা বলছেন, অথবা সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের কথা বুঝিয়েছেন-সেটি তার ওই খণ্ডিত বক্তব্যে পুরোপুরি অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
তবে তার এই মন্তব্য থেকে একটি বিষয় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সমরবিদদের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য লড়াইয়ে সিরিয়াকে সরাসরি যুক্ত করার একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী নীলনকশা প্রণয়ন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মিডেল ইস্ট আই-এর ওই বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এর আগে গত সতেরোই মার্চ আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য বার্তাসংস্থা রয়টার্স তাদের নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, হিজবুল্লাহ দমনে লেবাননের অভ্যন্তরে সরাসরি সিরীয় সেনা পাঠাতে দামেস্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে জোরালো আহ্বান জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু সিরিয়া সেই মার্কিন আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। দামেস্কের নীতিনির্ধারক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের প্রধান শঙ্কা হলো, লেবাননে যেকোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে সিরিয়া সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
এর ফলে দুই দেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর সীমান্তে নতুন করে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী ধর্মীয় দাঙ্গার সূত্রপাত হতে পারে, যা সিরিয়ার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। মূলত এই দূরদর্শী ও সতর্ক চিন্তাভাবনা থেকেই সিরিয়া এ বিষয়ে অত্যন্ত সংযত অবস্থান গ্রহণ করেছে।
প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, লেবাননে সিরীয় সেনা পাঠানোর এই অত্যন্ত বিতর্কিত প্রস্তাব নিয়ে ২০২৫ সালে প্রথম দফায় মার্কিন ও সিরীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে চলতি বছরের অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তখন এই বিষয়টি নিয়ে আবারও পর্দার আড়ালে গভীর আলোচনা হয়।
মিডেল ইস্ট আই জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেনা পাঠানোর এই জোরালো ও ক্রমাগত আহ্বানের পর সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল সারা তার দেশের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রুদ্ধদ্বার জরুরি বৈঠক করেন।
ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দীর্ঘ পর্যালোচনা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণের পর তারা সর্বসম্মতভাবে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, লেবাননের মাটিতে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালানো বা সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ন্যূনতম কোনো ইচ্ছা বর্তমান সিরিয়া সরকারের নেই।
আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা সুরক্ষায় দামেস্কের এই অটল ও আপসহীন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রভাব বিস্তারকারী বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।