মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এই শোকাবহ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সবকটি শাখাকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ঐতিহাসিক এই বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতারা ইরানে আগমন করছেন।
বিদেশি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুরো দেশে এক প্রকার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া দেশের বর্তমান সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং গৃহিত পদক্ষেপ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে অবহিত করেছেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আসন্ন জানাজায় অংশ নিতে আসা বিভিন্ন বন্ধুভাবাপন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বিশ্বনেতা এবং বিশিষ্ট ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানী তেহরানসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এই বিশেষায়িত বাহিনীকে যেকোনো আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বাধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত করা হয়েছে। জানাজা প্রাঙ্গণ এবং শোকযাত্রার নির্ধারিত রুটগুলোতে সাধারণ মানুষের ঢল নামার সম্ভাবনা থাকায়, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য নাশকতা রোধে গোয়েন্দা নজরদারিও বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
স্থলভাগের নিরাপত্তার পাশাপাশি ইরানের ভূখণ্ড ও আকাশসীমাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। জেনারেল আকরামিনিয়া আরও জানান যে, দেশের স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী নিজ নিজ সীমান্ত এলাকাজুড়ে তাদের টহল এবং উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে, যেন সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকে।
বিশেষ করে সমুদ্রসীমা এবং সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও সেনাদল মোতায়েন করা হয়েছে। একই সাথে ইরানের অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশের সমগ্র আকাশসীমায় নিরবচ্ছিন্ন ও চব্বিশ ঘণ্টা কঠোর নজরদারি বজায় রাখছে।
যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক উড্ডয়ন বা আকাশসীমা লঙ্ঘনের চেষ্টার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর সামরিক জবাব দেওয়ার জন্য বিমান বাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এক যৌথ আকস্মিক বিমান হামলায় ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।
এই মর্মান্তিক ও সুদূরপ্রসারী ঘটনার দীর্ঘ চার মাস পর অবশেষে ইরান রাষ্ট্রীয়ভাবে তার জানাজা ও দাফনকাজের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। এত দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার মূল কারণ হিসেবে এই মধ্যবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করার বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
একই সাথে এই দীর্ঘ সময়ে সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য সব ধরনের সংঘাত ও বহিরাগত আগ্রাসন মোকাবিলায় নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে আয়তিল্লাহ খামেনির এই জানাজা অনুষ্ঠানটি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও জাতীয় সংহতি প্রদর্শনের একটি বড় রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার মুখে এই বিশাল আয়োজনটি সফলভাবে সম্পন্ন করা ইরানের বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি মস্ত বড় পরীক্ষা।
ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের উস্কানিমূলক পদক্ষেপ প্রতিহত করতে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকেও সচল ও প্রস্তুত রেখেছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর গভীর নজর রাখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।