বুধবার, জুলাই ১, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খামেনির জানাজা উপলক্ষে তেহরানের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

খামেনির জানাজা উপলক্ষে তেহরানের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা এবং দাফন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন ও সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইরান সরকার।

 

এই নিশ্ছিদ্র ও কঠোর নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি প্রধান অংশ হিসেবে দেশটির রাজধানী তেহরানের আকাশসীমায় ব্যাপকভাবে উড়োজাহাজ বা বিমান চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

 

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি সংঘটিত ওই আকস্মিক ও প্রাণঘাতী হামলায় দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে চরম উত্তেজনাকর এবং সংবেদনশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক এমন একটি জটিল আবহের মধ্যেই এই বিশাল পরিসরের শেষকৃত্যের আয়োজন করতে যাচ্ছে তেহরান।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে ইরানের রাষ্ট্রীয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বার্তার বরাত দিয়ে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরটি বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করা হয়েছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার প্রধান আবুজার শিরুডি দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের কাছে এই আকাশপথের নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তুলে ধরেছেন।

 

তিনি তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ঐতিহাসিক এই জানাজার সার্বিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগামী শুক্রবার সকাল থেকে রাজধানী তেহরানের অন্যতম প্রাচীন ও প্রধান মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হবে। তবে এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি ও বিশেষ কিছু বিমানকে শর্তসাপেক্ষে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

 

শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের বহনকারী বিশেষ বিমানগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থেকে চলাচল করতে পারবে।

 

এর পাশাপাশি সাধারণ দেশি ও বিদেশি যাত্রীদের যেন এমন একটি শোকাবহ দিনে চরম ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রেখে ওই দিনটিতে তেহরানের অপর বৃহৎ, আধুনিক ও ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক টার্মিনাল, ইমাম খোমেনি বিমানবন্দরটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে বলে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

 

তবে জানাজার মূল অনুষ্ঠান ও জনসমুদ্রকে ঘিরে আকাশপথের নিরঙ্কুশ নিরাপত্তায় সামান্যতম কোনো ধরনের ছাড় দিতে বা আপস করতে একেবারেই রাজি নয় ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সামরিক বাহিনী।

 

বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার প্রধান আবুজার শিরুডি তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, আগামী সোমবার যখন তেহরানের রাজপথে সর্বোচ্চ নেতার মূল জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, তখন রাজধানীর বিশাল আকাশ সম্পূর্ণভাবে উড়োজাহাজ শূন্য বা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার এক দুর্ভেদ্য চাদরে ঢাকা থাকবে।

 

ওই দিনটিতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তার ঝুঁকি না নিতে এবং রাষ্ট্রীয় শোকের পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখতে তেহরানের প্রধান দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-মেহরাবাদ এবং ইমাম খোমেনি-থেকে সব ধরনের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী বিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণ পুরোপুরিভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

 

এত বিশাল সংখ্যক শোকার্ত মানুষের সমাগম এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আসা আন্তর্জাতিক অতিথিদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে আকাশপথের এই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ, বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের সময়সূচি ও স্থানগুলোর বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করা হয়েছে।

 

সরকারি ঘোষণা ও পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৪ঠা জুলাই থেকে শুরু করে ৮ই জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ দিনব্যাপী অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র শহরে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা এবং দাফনের আনুষ্ঠানিকতা ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

 

এর মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরান, শিয়া সম্প্রদায়ের অত্যন্ত পবিত্র ও ধর্মীয় আকিদার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র কুম শহর এবং আধ্যাত্মিক ভাবগাম্ভীর্যে পূর্ণ ঐতিহাসিক মাশহাদ শহরে লাখো শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে বিশাল জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

কেবল ইরানের ভৌগোলিক সীমান্তের ভেতরেই নয়, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের অত্যন্ত পবিত্র ও ঐতিহাসিক শহরগুলোতেও এই শীর্ষ নেতার প্রতি শেষ ও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বিশেষ শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা আয়োজনের ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

 

শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত ইরাকের রাজধানী বাগদাদ, কাজমিন, ঐতিহাসিক কারবালা এবং পবিত্র নাজাফ শহরেও সুবিশাল পরিসরে এই শোকানুষ্ঠান ও ধর্মীয় রীতিনীতি অত্যন্ত ভক্তির সঙ্গে পালন করা হবে।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এমন একজন শীর্ষ পর্যায়ের ও প্রভাবশালী নেতার আকস্মিক মৃত্যুতে গোটা অঞ্চলে যে গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভের মিশ্র আবহ তৈরি হয়েছে, এই বিশাল ও বিস্তৃত জানাজার আয়োজন মূলত তারই এক সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী প্রতিফলন।

 

প্রশাসনের এই ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি প্রমাণ করে যে, এই জানাজা কেবল একজন ধর্মীয় নেতার চিরবিদায় নয়, বরং এটি জাতীয় সংহতি ও রাষ্ট্রীয় শোক প্রকাশের এক ঐতিহাসিক মঞ্চ হতে চলেছে।

 

- বিবিসি