তিনি স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়েছেন যে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ ইরানে আঘাত হানার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের কৌশলগত প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করে রেখেছে। এখন কেবল সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত বা নির্দেশের অপেক্ষা মাত্র, সেই নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তারা পূর্ণ শক্তিতে সর্বাত্মক হামলা শুরু করবে।
গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক বিশেষ ও দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি তার সরকারের পূর্ববর্তী সামরিক পদক্ষেপগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “ইতিমধ্যেই আমরা ইরানের মাটিতে অত্যন্ত সফলভাবে দু’বার সামরিক হামলা পরিচালনা করেছি।
আমাদের সেই দু’বারের সুনির্দিষ্ট হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলকে পরমাণু বোমার সম্ভাব্য অস্তিত্ব বিনাশী হামলার ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা এবং আমরা সেই উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হয়েছি। তবে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা যদি পুনরায় সামান্যতমও বিঘ্নিত হয়, তবে তৃতীয়বারের মতো ইরানে ভয়াবহ হামলা চালাতে আমরা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করব না।
এ বিষয়ে আমাদের সামরিক বাহিনীর সবধরনের আগাম প্রস্তুতি ও নিখুঁত পরিকল্পনা গ্রহণ করা আছে।” ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী ও চলমান উত্তেজনার শেকড় মূলত ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের ৬ জুন জাতিসংঘের পরমাণু প্রকল্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি এজেন্সি’ বা আইএইএ তাদের এক বিস্তারিত ও উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, ইরানের কাছে সে সময় প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত রয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল, সেই সংরক্ষিত ইউরেনিয়ামের বিশুদ্ধতার মান ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞরা তখন সতর্ক করে বলেছিলেন যে, ইরান যদি তাদের এই ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে এবং কোনোভাবে এর বিশুদ্ধতার মান ৯০ শতাংশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়, তবে সেই উচ্চমাত্রার সামরিক গ্রেডের ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে খুব অনায়াসেই ভয়াবহ ধ্বংস ক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের ওই সতর্কতামূলক বিবৃতি প্রকাশের মাত্র পাঁচ দিন পর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১১ জুন গভীর রাতে ইসরায়েল ইরানের অভ্যন্তরে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ বা গর্জানশীল সিংহ নামের এক অভাবনীয় ও অতর্কিত সামরিক অভিযান শুরু করে।
টানা বারো দিন ধরে চলা সেই ভয়াবহ ও তীব্র সামরিক অভিযানে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। এমনকি সেই হামলায় ইরানের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানীও নিহত হন, যা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ব্যাহত করে।
পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ এড়াতে ও শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপে এবং প্রবল চাপে ইসরায়েল তাদের সেই সামরিক অভিযান মাঝপথেই থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
তবে পরমাণু ইস্যু নিয়ে এই দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ কখনোই পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। এই একই মতবিরোধের জের ধরে চলতি বছরের অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আবারও এক যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
কিন্তু সেই অভিযান শুরুর মাত্র দু’দিনের মাথায় কৌশলগত ও রাজনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এই অভিযান থেকে সরিয়ে দেয় এবং নিজেরাই এর একক নেতৃত্ব গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পর থেকে ইসরায়েল বাধ্য হয়ে তাদের সামরিক অভিযানের পরিধি কেবল লেবানন সীমান্তেই সীমিত রেখেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এমন এক স্পর্শকাতর ও জটিল সময়ে ইরানকে তৃতীয়বারের মতো হামলার এই নতুন হুঁশিয়ারি দিলেন, যখন ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’র আওতায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।
কেবল যুদ্ধবিরতিই নয়, উভয় দেশের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের জন্য জোর কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রস্তুতিও বর্তমানে চলমান রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী অবশ্য ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত এই নতুন শান্তিচুক্তি মেনে চলতে ইসরায়েল কোনোভাবেই আইনত বা নৈতিকভাবে বাধ্য নয়।
তবে এই বিষয়ে নেতানিয়াহু খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অত্যন্ত কঠোর ও নজিরবিহীন সতর্কবার্তার কারণে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মার্কিন মিত্রতার হাত চিরতরে সরিয়ে নেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি প্রদান করেছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ্য করে তার সেই বার্তায় বলেছিলেন, “বিবি, আপনি কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে অবশ্যই চরম সাবধানতা অবলম্বন করবেন; তা না হলে খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আপনাকে সম্পূর্ণ একা হয়ে যেতে হবে।”
আনাদোলু এজেন্সি এবং ইন্ডিয়া টুডে-এর মতো নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের এই অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক সমীকরণের বিশদ তথ্য জানা গেছে।