প্রয়াত নেতার সন্তান এবং ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবার জানাজার নামাজে সরাসরি উপস্থিত থেকে ইমামতি করার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী তার এই ইচ্ছায় কঠোরভাবে বাধা প্রদান করেছে।
দেশের বর্তমান সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক গুপ্তহত্যার সরাসরি হুমকির কথা বিবেচনা করে নিরাপত্তা বাহিনী মোজতবাকে যেকোনো মূল্যে প্রকাশ্যে আসার বিষয়ে নিষেধ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে একটি স্বাধীন দেশের সর্বোচ্চ নেতার নিজের জন্মদাতা পিতার জানাজায় উপস্থিত হতে না পারার এই বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে ভারতে নিযুক্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হাকিম ইলাহী এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জনসমক্ষে নিশ্চিত করেছেন।
তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওই ভয়াবহ সামরিক হামলার পর বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসতে চেয়েছিলেন। একজন শোকার্ত সন্তান হিসেবে পিতার শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছা তার জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ও আবেগপূর্ণ একটি বিষয় ছিল।
কিন্তু ইরানের শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমান রণাঙ্গন পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে আসা তার ব্যক্তিগত জীবনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং চরম বিপজ্জনক হতে পারে। হাকিম ইলাহী সংবাদমাধ্যমকে আরও জানান যে, গত সপ্তাহে তিনি ব্যক্তিগত এক সফরে ইরানে অবস্থান করছিলেন।
সেখানে তিনি এমন কয়েকজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যারা সরাসরি বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাদের মাধ্যমেই তিনি বিস্তারিত জানতে পেরেছেন যে, মোজতবা খামেনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রকাশ্যে এসে বাবার জানাজার নামাজ পড়ানোর আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন।
কিন্তু দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বর্তমান বাস্তবতায় তার এই সিদ্ধান্তে বিন্দুমাত্র সমর্থন প্রদান করেননি। নিরাপত্তা বাহিনীর এই আপসহীন ও অনমনীয় অবস্থানের পেছনের মূল কারণ হলো শত্রু রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বব্যাপী নজরদারি ব্যবস্থা।
হাকিম ইলাহী এই গভীর আশঙ্কার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো এবং ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর হাতে বর্তমানে এমন সব অত্যন্ত উন্নত এবং নিখুঁত গুপ্তচর প্রযুক্তি রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা খুব সহজেই যেকোনো সংবেদনশীল ব্যক্তির নিখুঁত অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম।
মোজতবা খামেনি যদি সাধারণ মানুষের এই বিশাল জনসমাগমের মধ্যে প্রকাশ্যে জানাজায় অংশ নেন, তবে উন্নত কৃত্রিম উপগ্রহ, ড্রোন ও গোয়েন্দা প্রযুক্তির মাধ্যমে তাকে অত্যন্ত সহজেই শনাক্ত করে অনুসরণ করা সম্ভব হবে।
আর বর্তমান এই যুদ্ধাবস্থায় শত্রুপক্ষ যেকোনো সময় তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে, যা ইরানের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অভাবনীয় ও অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে। মূলত এই কারণেই নিরাপত্তা বাহিনী মোজতবাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, এমন উন্মুক্ত ও বিশাল একটি আয়োজনে তার জীবনের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব।
আর ঠিক এই অকাট্য যুক্তির কারণেই বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা শেষ পর্যন্ত জনসমক্ষে আসবেন না বলেই মনে করছেন হাকিম ইলাহী। তাহলে আয়তুল্লাহ আলি খামেনির মতো একজন শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী নেতার এই ঐতিহাসিক জানাজার নামাজ কে পড়াবেন, এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিনিধি হাকিম ইলাহী জানান যে, মোজতবা খামেনি এখন পর্যন্ত জানাজা পড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট করে কারও নাম ঘোষণা বা কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত করেননি।
তিনি বলেন, প্রথাগতভাবে এবং দেশের পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক থাকত, তবে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিরই এই জানাজার নামাজ পড়ানোর কথা ছিল। এটি একটি জাতির জন্য একই সঙ্গে প্রয়াত নেতার প্রতি চরম সম্মান প্রদর্শন এবং নতুন নেতার প্রতি জনগণের নিঃশর্ত আনুগত্য ও ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি দৃশ্যমান প্রতীকী রূপ।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান যুদ্ধবিধ্বস্ত, উত্তেজনাপূর্ণ এবং চরম নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি এর জন্য একেবারেই অনুকূলে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় মুহূর্তে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এমন দৃশ্যমান অনুপস্থিতি দেশটির বর্তমান চরম সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিরই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
একদিকে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে সাবেক নেতার শেষ বিদায়ের বিশাল আয়োজন চলছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য শত্রুর নিখুঁত হামলার ভয়ে নতুন নেতাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে হচ্ছে-এই পরিস্থিতি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমরবিদ্যায় এক বিরল দৃষ্টান্ত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, শেষ পর্যন্ত কার নেতৃত্বে আয়তুল্লাহ আলি খামেনির এই ঐতিহাসিক জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং এই ঘটনাপ্রবাহ ইরানের ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় ঐক্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের ওপর কতটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।