বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খামেনির জানাজায় প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে ভারত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

খামেনির জানাজায় প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে ভারত
ছবি : Collected

ইরানের সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য এবং নামাজে জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদল পাঠানোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে প্রতিবেশী ও ঐতিহ্যগত মিত্র রাষ্ট্র ভারত।

 

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এই নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখার অংশ হিসেবে ভারতের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার একটি বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই সুনির্দিষ্ট তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারতের এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সুগভীর সম্পর্কেরই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকগণ।

 

ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, শুক্রবার ভারতের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল তেহরানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্রী পবিত্র মার্গেরিটা এবং ভারতের বিহার রাজ্যের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন।

 

তারা ভারত সরকার এবং দেশের কোটি কোটি মানুষের পক্ষ থেকে ইরানের এই জাতীয় শোকের মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে সমবেদনা জ্ঞাপন করবেন। একই সঙ্গে, তারা প্রয়াত নেতা খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থেকে ভারতের কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করবেন।

 

রাষ্ট্রীয় শোকের এমন একটি সংবেদনশীল ও ভাবগম্ভীর সময়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই সফর প্রমাণ করে যে, ভারত তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ককে কতটা নিবিড় ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বলে বিবেচনা করে।

 

নয়াদিল্লির সাউথ ব্লক তথা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব কেবল একটি প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান হাজার বছরের দীর্ঘ সভ্যতাগত সম্পর্ক এবং উভয় দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক যোগাযোগের অসীম গুরুত্বকে নির্দেশ করে।

 

ঐতিহাসিক কাল থেকেই ভারত ও ইরানের মধ্যে ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, আধ্যাত্মিকতা এবং বাণিজ্যিক যে অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন রয়েছে, এই শোকাবহ মুহূর্তে ভারতের এমন পদক্ষেপ সেই প্রাচীন শিকড়কে আরও সুদৃঢ় করার একটি আন্তরিক প্রয়াস।

 

একই সঙ্গে, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক বোঝাপড়া এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে শক্ত ভিত গড়ে উঠেছে, ভারতের এই প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত তারই এক উজ্জ্বল ও অকাট্য প্রতিফলন।

 

বিশেষ করে চাবাহার বন্দরের মতো বৃহৎ সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে এই সম্পর্ক বর্তমানে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে, যার প্রভাব এই কূটনৈতিক শিষ্টাচারেও দৃশ্যমান।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং শোক পালনের সার্বিক প্রস্তুতি কমিটির পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা এবং আনুষঙ্গিক শোকানুষ্ঠান আগামী শনিবার রাজধানী তেহরানে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে শুরু হতে যাচ্ছে।

 

রাজধানী তেহরানে সাধারণ জনগণ, রাষ্ট্রীয় পদস্থ কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের পর, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর প্রদক্ষিণ করে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। সবশেষে, আগামী ৯ জুলাই ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ খোরাসান রাজাভির অন্তর্গত পবিত্র শহর মাশহাদে নিয়ে যাওয়া হবে খামেনির নিথর দেহ।

 

সেখানে, তার নিজ জন্মভূমিতে সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে এই শোকাবহ শেষকৃত্যের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার চিরস্থায়ী পরিসমাপ্তি ঘটবে। এই দীর্ঘ ও স্মরণীয় শোকযাত্রায় দেশের লাখো শোকার্ত মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে দৃঢ়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

 

কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ইরানের এই পালাবদলের এবং চরম শোকের সন্ধিক্ষণে ভারতের এমন সংবেদনশীল ও ইতিবাচক অংশগ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নানা মেরুকরণ ও বিভাজন থাকলেও, ঐতিহ্যগত মিত্রদের যেকোনো সংকটে বা শোকে পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি যে সর্বদা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অত্যন্ত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে, এই পদক্ষেপ মূলত তারই একটি জোরালো প্রমাণ দেয়।

 

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মতো একজন দীর্ঘমেয়াদী, প্রজ্ঞাবান ও অসীম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়কের চিরবিদায়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল যখন এক অজানা ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক আবহের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতের মতো একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি ইরানের প্রতি তাদের অবিচল বন্ধুত্বের এক চিরন্তন বার্তা হিসেবেই বিশ্ববাসীর কাছে বিবেচিত হচ্ছে।

 

দুই দেশের এই সুগভীর কূটনৈতিক ও আত্মিক নৈকট্য আগামী দিনগুলোতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, শান্তি আনয়ন এবং পারস্পরিক উন্নয়নের পথকে আরও অনেক বেশি মসৃণ ও গতিশীল করবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

- আল জাজিরা