যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এক নজিরবিহীন যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এই শোকাবহ ও সংকটময় মুহূর্তে জাতীয় ঐক্য এবং পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধের বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর তেহরান। এরই ধারাবাহিকতায়, আগামী শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে সর্বস্তরের জনগণকে দলে দলে যোগ দেওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
এই বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ গ্রহণের এক অনমনীয় শপথ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরাই এখন ইরানি নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন বিবৃতিতে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশবাসীর প্রতি এই বিশেষ আহ্বান জানান।
তিনি তার বিবৃতিতে সর্বোচ্চ নেতার আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই ক্রান্তিলগ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকার বিনীত অনুরোধ করেন। গালিবাফ তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, ‘আমি ইরানের সব জনগণকে আহ্বান জানাই, শনিবার থেকে শুরু হওয়া জানাজার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ইসলামী ইরানের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করুন।’
তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, ইরান সরকার এই জানাজাকে কেবল একটি প্রথাগত ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না, বরং এটিকে জাতীয় সংহতি ও শক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে।
বিবৃতিতে গালিবাফ কেবল শোক প্রকাশের মধ্যেই তার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই প্রাণঘাতী হামলার চূড়ান্ত ও কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার যে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার রয়েছে, সেটিও পুনরায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন।
চরম ক্ষোভ ও দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, ‘জাতির প্রতিশোধের আহ্বান যেন পুরো বিশ্বের কানে পৌঁছে যায়।’ এই বাক্যটির মাধ্যমে তিনি কার্যত পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইসরায়েলকে একটি প্রচ্ছন্ন ও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পরিণাম হিসেবে তাদের অচিরেই ইরানের দিক থেকে এক ভয়াবহ ও সম্মিলিত সামরিক বা কৌশলগত জবাবের মুখোমুখি হতে হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মতো একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং সুদীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল প্রভাব ফেলবে।
শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ঐতিহাসিক বিদায়যাত্রা এবং শোকানুষ্ঠানকে ঘিরে রাজধানী তেহরানসহ পুরো দেশজুড়ে এক অভাবনীয় ও নিশ্ছিদ্র প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, এই কয়েক দিনব্যাপী কর্মসূচিতে বিপুল জনসমাগমের মাধ্যমে মূলত দুটি অকাট্য বার্তা তুলে ধরা হবে-প্রথমত, যেকোনো বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানি জাতির ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য এবং দ্বিতীয়ত, যেকোনো পরিস্থিতিতে মাথা নত না করার এক আপসহীন প্রতিরোধের সংস্কৃতি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো একজন অভিজ্ঞ, রণকৌশলী ও প্রভাবশালী নেতার এই ডাক সাধারণ ইরানিদের মধ্যে প্রবল আবেগ ও জাতীয়তাবাদের জন্ম দেবে। ইরানের পরমাণু চুক্তিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে প্রধান আলোচক হিসেবে গালিবাফের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে এই আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
অতীতেও ইরানের কোনো শীর্ষস্থানীয় সামরিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের হত্যাকাণ্ডের পর সে দেশে অভাবনীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত জনসমাগম দেখা গেছে। সেই বিশাল জনসমুদ্র মূলত বহিঃশত্রুদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি অত্যন্ত কার্যকরী ও শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।
খামেনির জানাজায় জনগণের এই ঢল বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করবে যে, শীর্ষ নেতার মৃত্যুতে দেশের সরকার বা শাসনব্যবস্থা বিন্দুমাত্র দুর্বল হয়নি, বরং বাইরের চরম আঘাত তাদের আরও বেশি সংঘবদ্ধ করেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ যে অত্যন্ত নাজুক ও সংবেদনশীল অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে খামেনির এই ঐতিহাসিক জানাজা এবং সেখানে সমবেত লাখো জনতার প্রতিশোধের তীব্র দাবি পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও কতখানি জটিল করে তুলবে, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনীতির অন্যতম প্রধান পর্যবেক্ষণের বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরানের এই সম্ভাব্য সামরিক প্রত্যাঘাত কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিশ্ব নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ইরানের এই বিশাল জনসমুদ্র, তাদের রণধ্বনি এবং তেহরানের পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপগুলোর দিকে সার্বক্ষণিক ও তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইরান যে তাদের সর্বোচ্চ নেতার রক্ত বৃথা যেতে দেবে না, গালিবাফের এই বিবৃতি তারই এক সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন আন্তর্জাতিক ঘোষণা।