পাশাপাশি, বিস্ফোরণের তীব্রতায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১৬ জন মানুষ। বৃহস্পতিবার সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল আল-ইখবারিয়া দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাত দিয়ে এই গভীর উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলুও তাদের নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে এই প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্ববাসীকে অবহিত করেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের এই ভয়াবহ বিস্ফোরণটি ঘটে রাজধানী দামেস্কের অন্যতম ব্যস্ত, ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা আল-নাসর সড়কে।
এই সড়কেই দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সরকারি স্থাপনা বিচার প্রাসাদ অবস্থিত। এই বিচার প্রাসাদের একেবারে সন্নিকটেই অবস্থিত ওই ক্যাফেটি প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ মানুষ, পথচারী, আইনজীবী এবং সরকারি সেবাগ্রহীতাদের পদচারণায় মুখর থাকে।
পুলিশ ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের প্রাথমিক তদন্তে স্পষ্টভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, জনবহুল ওই ক্যাফের ভেতরে আগে থেকেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে শক্তিশালী বিস্ফোরক বা বোমা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। দিনের অন্যতম ব্যস্ততম সময়ে আচমকা সেই বিস্ফোরকের ভয়ানক বিস্ফোরণ ঘটলে মুহূর্তের মধ্যেই ক্যাফেটির ভেতরের চারপাশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ভাঙা কাচ, ধ্বংসাবশেষ এবং নিরপরাধ মানুষের রক্ত। আকস্মিক এই হামলায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক, কান্না ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। বিস্ফোরণের পরপরই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা।
সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় সিরিয়ার জরুরি উদ্ধারকারী দল, বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং চিকিৎসা কর্মীরা। তারা সাইরেন বাজিয়ে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করেন।
সিরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং হতাহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আহত ১৬ জনের মধ্যে বেশ কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা সামনের দিনগুলোতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে চিকিৎসকরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সাধারণ নাগরিকদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা গোটা দামেস্ক শহরে নতুন করে এক গভীর শোক ও ভীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। নৃশংস এই হামলার পরপরই দামেস্কের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য পুরো আল-নাসর সড়ক এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলেছেন।
সাধারণ মানুষের চলাচলে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করে ঘটনাস্থলে নিবিড় তল্লাশি ও বৈজ্ঞানিক আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে অপরাধ তদন্ত বিজ্ঞানের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা। আশপাশের ভবনে থাকা নিরাপত্তা ক্যামেরার দৃশ্য সংগ্রহ করে তা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী, সন্ত্রাসী সংগঠন বা চরমপন্থি দল এই ভয়াবহ বোমা হামলার দায়ভার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে কারা, কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে এতটা নিশ্চিন্তে এমন একটি সুপরিকল্পিত ও প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে, তার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে সিরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনী একটি বিস্তৃত ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাতে সিরিয়া একটি চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বিগত কয়েক বছরে রাজধানী দামেস্কের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দৃশ্যত কিছুটা উন্নতি হলেও এবং শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও, মাঝেমধ্যেই এমন অতর্কিত ও প্রাণঘাতী বোমা হামলার ঘটনা দেশটিতে বিরাজমান ভঙ্গুর ও নাজুক নিরাপত্তার বাস্তব চিত্রটিই বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে তুলে ধরে।
বিচার প্রাসাদের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কঠোরভাবে সুরক্ষিত সরকারি স্থাপনার ঠিক পাশেই এমন একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা দেশটির গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সার্বিক কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে বিভিন্ন মহলে যৌক্তিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
যুদ্ধক্লান্ত সিরিয়ার সাধারণ মানুষ যখন শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এমন হামলা তাদের সেই আশার আলো নিভিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিরীহ নাগরিকদের ওপর চালানো এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সিরিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, আইনের শাসন ও টেকসই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ওপর পুনরায় অত্যন্ত জোরালোভাবে জোরারোপ করছে।