আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, এটি হতে যাচ্ছে ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং নজিরবিহীন এক জানাজা অনুষ্ঠান। কেবল ইরানের অভ্যন্তরেই নয়, বরং শিয়া মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও সংবেদনশীল স্থান হিসেবে বিবেচিত ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরেও এই শীর্ষ নেতার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে।
এর ফলে এই শেষ বিদায়যাত্রাটি এক বিশাল আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহাসমাবেশে রূপ নিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও লজিস্টিক কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী শনিবার, ৪ এপ্রিল থেকে এই দীর্ঘ বিদায় আনুষ্ঠানিকতার মূল পর্ব শুরু হতে যাচ্ছে।
প্রথম দিনে রাজধানী তেহরানে নির্মাণাধীন বিশালাকার ইমাম খোমেনি মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রয়াত নেতার মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এরপর সোমবার তেহরানের প্রধান প্রধান সড়ক ও রাজপথজুড়ে তার নিথর দেহবাহী এক বিশাল শোক মিছিলের আয়োজন করা হবে।
তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মঙ্গলবার খামেনির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরানের অন্যতম ধর্মীয় কেন্দ্র ও পবিত্র শহর কোমে। সেখান থেকে শোকযাত্রাটি সীমান্ত পেরিয়ে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে প্রবেশ করবে।
কারবালার ঐতিহাসিক প্রান্তরে বিশেষ প্রার্থনা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আগামী ৯ জুলাই খামেনির মরদেহ তার নিজের জন্মস্থান ইরানের মাসহাদ শহরে ফিরিয়ে আনা হবে এবং সেখানেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আলজাজিরার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে খামেনির এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বিশ্ব সম্প্রদায়ের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ছয় দিনব্যাপী এই বিস্তৃত কর্মসূচিতে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটতে পারে, যা সমসাময়িক বিশ্বে এক অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
এই বিশাল জনসমাগমকে সফলভাবে সামাল দিতে এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরান ও ইরাকের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শোকযাত্রার পুরো রুটজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ এই জানাজায় অংশ নিতে তেহরান সফর করবেন।
পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও এই গভীর শোকাবহ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তবে পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততা ও কূটনৈতিক সমীকরণের কারণে তার এই সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল মনে করছেন।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দীর্ঘ চার মাস ধরে ইরান সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব পুনর্গঠনের কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিশাল জানাজা ও শোকযাত্রার আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি পশ্চিমা শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের জাতীয় সংহতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অদম্য সামরিক প্রতিরোধের এক শক্তিশালী বার্তা প্রদর্শন করবে।
ইরাকের কারবালা ও নাজাফের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে এই বিদায়যাত্রায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আবেগকে এক সুতোয় বাঁধার একটি প্রচ্ছন্ন কূটনৈতিক প্রয়াসও লক্ষণীয়। ফলে, আগামী ৯ জুলাই মাসহাদে চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত পুরো বিশ্বের কূটনৈতিক ও সংবাদ মাধ্যমগুলোর গভীর নজর থাকবে মধ্যপ্রাচ্যের এই নজিরবিহীন ঘটনাপ্রবাহের ওপর।