বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলিদের ভয় দেখাতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নেতানিয়াহুর মিথ্যাচার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম

ইসরায়েলিদের ভয় দেখাতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নেতানিয়াহুর মিথ্যাচার
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মূল কেন্দ্রে থাকা ইরান ও ইসরায়েল সংকট নিয়ে এবার খোদ ইসরায়েলের অভ্যন্তরেই তৈরি হয়েছে চরম রাজনৈতিক ও সামরিক বিতর্ক। সাধারণ ইসরায়েলি নাগরিকদের মনে আতঙ্ক ও গভীর ভীতি সঞ্চার করার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়ে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন বলে এক বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট।

 

তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি চরম অস্থিতিশীল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।

 

ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদমাধ্যম ইয়েদিয়ত আহরোনোত বুধবার, ১ জুলাই প্রকাশিত তাদের একটি বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে।

 

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মধ্য ইসরায়েলে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট বর্তমান সরকারপ্রধানের তীব্র সমালোচনা করেন।

 

সেখানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও গণমাধ্যমের সামনে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার যে কথা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রতিনিয়ত প্রচার করে আসছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ও অসত্য।

 

ওই নিরাপত্তা সম্মেলনে দেওয়া নিজের বক্তব্যে গাদি আইজেনকট অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দেশের মানুষের সামনে জঘন্য মিথ্যা কথা বলছেন। ঐতিহাসিক, সামরিক বা গোয়েন্দা-কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই ইরানের কাছে কখনোই কোনো পারমাণবিক বোমা ছিল না।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, নেতানিয়াহু মূলত সাধারণ ইসরায়েলিদের মানসিকভাবে ভীতসন্ত্রস্ত রাখতে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার মতো হীন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যেই এই ধরনের ভিত্তিহীন ও ভীতিকর কথা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার করছেন।

 

উল্লেখ্য, গাদি আইজেনকট বর্তমানে ইসরায়েলের রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং তিনি প্রভাবশালী বিরোধী দল ইয়াশার পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সামরিক বাহিনীর সাবেক শীর্ষ ও অত্যন্ত ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হওয়ায় জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে তার এই সুস্পষ্ট ও সরাসরি মন্তব্য দেশটিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

সাবেক সেনাপ্রধানের এই নজিরবিহীন মন্তব্যের ঠিক কয়েকদিন আগেই গত বুধবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১৪ কে দেওয়া এক বিশেষ ও বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ বিপরীত দাবি করেছিলেন।

 

ওই সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, ইরানের কাছে ইতিমধ্যে পারমাণবিক বোমা মজুত ছিল এবং সেগুলো ব্যবহার করে তারা ইসরায়েল রাষ্ট্রকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক গভীর ও ভয়াবহ পরিকল্পনা করছিল।

 

ওই সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু নিজের নেওয়া সামরিক পদক্ষেপগুলোর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছিলেন, তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্রকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ইরানে দুইবার অনুপ্রবেশ বা সামরিক হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

 

ইরানের হাতে ইতিমধ্যে যেসব বিধ্বংসী পারমাণবিক অস্ত্র মজুত ছিল, সেগুলো দিয়ে তারা যেকোনো মুহূর্তে ইসরায়েলের ওপর ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়ে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিত বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।

 

প্রধানমন্ত্রীর এমন অতি আত্মবিশ্বাসী এবং ভয়াবহ দাবির পরপরই মূলত সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট জনসমক্ষে এসে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি আসলে পুরোপুরি ভুয়া এবং একটি সাজানো রাজনৈতিক নাটক।

 

সামরিক ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে সর্বোচ্চ ধারণা রাখা একজন সাবেক সেনাপ্রধানের এমন প্রকাশ্য বিরোধিতা প্রমাণ করে যে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে খোদ ইসরায়েলি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচ্চপর্যায়েই গভীর মতবিরোধ ও তথ্যের চরম অসামঞ্জস্যতা রয়েছে।

 

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরান দীর্ঘ সময় ধরেই অত্যন্ত জোরালো ও ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বা যাবতীয় কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

 

তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষি খাতের উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো জনকল্যাণমূলক ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্যই তারা কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ করছে, মানব বিধ্বংসী কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য নয়।

 

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাও বিভিন্ন সময়ে তাদের অত্যন্ত কড়া পরিদর্শনে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র মজুত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট, চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ আজ পর্যন্ত পায়নি। সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাবেক ইসরায়েলি সেনাপ্রধানের এই বিস্ফোরক মন্তব্য কেবল প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেই চরম প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা নিয়ে ইসরায়েলের যে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় বয়ান রয়েছে, সেটিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নতুন করে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখছে।

 

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টিকে থাকার একান্ত স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মতো চরম সংবেদনশীল বিষয়কে নির্লজ্জভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার যে গুরুতর অভিযোগ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে উঠেছে, তা আগামী দিনে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও বড় ধরনের মেরুকরণ ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বলে দৃঢ়ভাবে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

- ইয়েদিয়ত আহরোনোত