ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পাহারায় তারা ইসলামের অন্যতম এই পবিত্র ধর্মীয় উপাসনালয়ের চত্বরে প্রবেশ করে এবং সেখানে অত্যন্ত উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
এমন একটি সংবেদনশীল ও পবিত্র সময়ে এই অনধিকার প্রবেশের ঘটনা কেবল ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় অনুভূতিতেই চরম আঘাত হানেনি, বরং সমগ্র অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের তীব্র আশঙ্কা তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর বরাত দিয়ে জানা যায়, গত বুধবার, অর্থাৎ ত্রিশে জুন, জেরুজালেম গভর্নরেটের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতিতে এই বেআইনি অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সংবাদমাধ্যমে প্রেরিত ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এদিন সকালের দিকে বেশ কিছু উগ্রপন্থী ইহুদি বসতিস্থাপনকারী সুসংগঠিত ও দলবদ্ধভাবে ঐতিহাসিক আল আকসা মসজিদ চত্বরের ভেতরে এবং এর চারপাশের আঙিনায় প্রবেশ করে।
পবিত্র এই স্থানে জোরপূর্বক প্রবেশ করার পর তারা অত্যন্ত বিতর্কিত এবং উসকানিমূলকভাবে প্রাঙ্গণের বিভিন্ন অংশে টহল দিতে থাকে। একইসঙ্গে তারা সেখানে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, প্রার্থনা ও রীতিনীতি প্রকাশ্যে পালন করতে শুরু করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই পুরো অনধিকার প্রবেশের সময়টিতে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ওই কট্টরপন্থী বসতিস্থাপনকারীদের চারপাশে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রদান করে।
একদিকে যখন বহিরাগতরা পবিত্র প্রাঙ্গণে উসকানিমূলক আচরণ ও নিয়মবহির্ভূত আচার পালন করছিল, ঠিক সেই সময়ে অন্যদিকে সাধারণ ফিলিস্তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রাত্যহিক উপাসনা, মসজিদে প্রবেশ ও স্বাভাবিক চলাচলে তীব্র বাধা সৃষ্টি করা হয়।
ইসরায়েলি বাহিনীর এই বৈষম্যমূলক আচরণ এবং ফিলিস্তিনিদের নিজ ধর্মীয় স্থানে প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানে মুহূর্তের মধ্যেই এক থমথমে, ভীতিকর ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পবিত্র রমজান মাসে যখন সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সংযম ও উপাসনায় নিমগ্ন থাকেন, ঠিক সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এমন পরিকল্পিত অনুপ্রবেশ ফিলিস্তিনিসহ গোটা মুসলিম বিশ্বের মানুষের মনে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য আল আকসা মসজিদ হলো মক্কা ও মদিনার পর তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। যুগ যুগ ধরে এই স্থানটির ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষায় একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও আন্তর্জাতিক সমঝোতা মেনে চলা হয়, যেখানে জর্ডানের ওয়াকফ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে অমুসলিমদের শুধুমাত্র পরিদর্শনের সুযোগ থাকলেও সেখানে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আচার বা উপাসনা পালনের কোনো ধরনের আইনি বা ঐতিহাসিক বৈধতা নেই।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় কট্টরপন্থী ইহুদিরা প্রতিনিয়ত এই নিয়ম লঙ্ঘন করে আসছে। ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে আল আকসা মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করার মাধ্যমে এই পবিত্র স্থানটির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের হীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই অত্যন্ত নাজুক ও স্পর্শকাতর। বিভিন্ন স্থানে চলমান সামরিক সংঘাত, মানবিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পুরো অঞ্চলটি যখন কার্যত একটি বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তখন জেরুজালেমের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানে এমন ধারাবাহিক উসকানি পরিস্থিতিকে যেকোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আল আকসা মসজিদে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের এই অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং উসকানিমূলক আচরণের কারণে ওই এলাকায় বসবাসরত ফিলিস্তিনি নাগরিক ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের গণ-অভ্যুত্থান বা সংঘর্ষের সূত্রপাত হতে পারে।
অতীতেও ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, আল আকসাকে কেন্দ্র করে এমন উসকানির জেরে বেশ কয়েকবার ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত, প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে রূপ নিয়েছিল।
এই ধরনের নাজুক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নীরবতা বা ধীর পদক্ষেপ নিয়েও নানা মহলে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠছে। অবিলম্বে এই ধরনের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা না গেলে, মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়া চিরতরে ধ্বংসের মুখে পড়বে এবং এর বিরূপ প্রভাব বিশ্ব শান্তিতেও পড়বে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন।