বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালি ইরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপস নয়

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

হরমুজ প্রণালি ইরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপস নয়
ছবি : Collected

বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের কথা আবারও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান পারমাণবিক আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই অত্যন্ত সংবেদনশীল সামুদ্রিক প্রণালিটিকে ইরানের ‘সবচেয়ে বড় হাতিয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি যুগান্তকারী সমঝোতা স্মারকের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি এই দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন। গালিবাফ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের সার্বভৌম অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে এবং বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক কোনো চাপেই ইরান তার এই অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসবে না।

 

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে যখন নিত্যনতুন মেরুকরণ চলছে, তখন ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের এই নেতার এমন মন্তব্য বৈশ্বিক কূটনীতির মনোযোগ নতুন করে আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা প্রেস টিভির সূত্রমতে, গালিবাফ তার সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।

 

তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক সেবার ফি বা মাশুল থেকে কেবল ষাট দিনের জন্য একটি সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে ইরান তার ঐতিহাসিক অধিকার থেকে সরে এসেছে।

 

প্রণালিটিকে নিজেদের বৈধ আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা হিসেবে উল্লেখ করে গালিবাফ বলেন, ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথের সামরিকীকরণ করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তার কোনো সুযোগ তেহরান দেবে না।

 

তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুদ্ধের সময় স্রষ্টার দেওয়া এক অমূল্য উপহার এবং দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার বলে বর্ণনা করেন। পাশাপাশি, সামরিক সক্ষমতার শক্ত ভিত থাকলে যে কূটনৈতিক পর্যায়েও অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের ঘটনাটিকে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে টানেন তিনি।

 

গালিবাফ জানান, পশ্চিমা নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পর মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে চার কোটি ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত দেশটির অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল ও তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন।

 

কূটনৈতিক এই আশাব্যঞ্জক সফলতার কথা স্বীকার করলেও গালিবাফ দেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সামরিক শক্তির অপরিহার্যতার কথা মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়কেই স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, ইরানের প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার একমাত্র নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ হচ্ছে এর নিজস্ব প্রতিরক্ষামূলক সামরিক পরাক্রম।

 

তাই দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা কোনো অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে দরকষাকষির বিষয়বস্তু হবে না। একইভাবে, পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়েও তেহরানের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

 

শান্তিকামী ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে ইরানের সম্পূর্ণ বৈধ, অবিচ্ছেদ্য ও অখণ্ডনীয় অধিকার বলে দাবি করেন গালিবাফ। তিনি আরও জানান, পারমাণবিক ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ইস্যুতে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারকে নির্ধারিত ষাট দিনের সময়সীমা প্রয়োজনে আরও বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

 

তবে তার প্রধান শর্ত হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের প্রাথমিক ও গৌণ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

 

সাক্ষাৎকারে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয়ের বিষয়টিও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। গালিবাফ জানান, হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক নৌসেবা পরিচালনা সংক্রান্ত যাবতীয় আইনি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর বিষয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ওমানের সঙ্গে ইরান ইতোমধ্যে একটি চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

 

তবে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বর্তমান সমঝোতা স্মারকে উল্লেখিত পাঁচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা সামনের দিকে এগোবে না।

 

এই অবশ্য পালনীয় শর্তগুলোর মধ্যে লেবাননে কার্যকর ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল রপ্তানির অবাধ নিশ্চয়তা প্রদান এবং বিদেশে জব্দকৃত ইরানের বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ অবিলম্বে মুক্ত করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রায়োগিক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও লেবানন সম্মিলিতভাবে একটি বিশেষ সংঘাত নিরসন কেন্দ্র বা ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠনে সম্মত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

ইতোমধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটন এই বিশেষ সেলের জন্য নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ করেছে এবং খুব শিগগিরই বৈরুতও তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি নিয়োগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

পরিশেষে গালিবাফ দাবি করেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মূল উদ্দেশ্য হলো লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করা; যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রস্তাবিত পৃথক কাঠামোগত চুক্তির একমাত্র লক্ষ্য হলো কেবল ইসরায়েলের একতরফা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা ওই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তির পরিপন্থী।

 

আল জাজিরা