বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাতারের মধ্যস্থতায় দোহায় শুরু হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম

কাতারের মধ্যস্থতায় দোহায় শুরু হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক কূটনৈতিক তৎপরতার সূচনা হয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে পরোক্ষ কারিগরি আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।

 

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈরিতা, আস্থাহীনতা এবং সাম্প্রতিক সময়ের নানামুখী সংঘাতের কারণে এই আলোচনাকে আন্তর্জাতিক মহল অত্যন্ত গভীর মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। বিবদমান এই দুই বৈরী রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক বা যোগাযোগ না থাকলেও, কাতার এবং পাকিস্তানের যৌথ ও নিবিড় মধ্যস্থতায় এই পরোক্ষ আলোচনাটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিরাজমান ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা নিরসনের ক্ষেত্রে এই পরোক্ষ উদ্যোগ একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে যে, বুধবার (১ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া এই আলোচনাটি মূলত উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক কোনো বৈঠক নয়, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে কারিগরি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

 

দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে আপাতত কোনো ধরনের মুখোমুখি বা সরাসরি বৈঠকের পরিকল্পনা নেই বলে ওই সূত্রটি নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি আরও জানিয়েছে যে, এই জটিল আলোচনার সুবিধার্থে এবং সুনির্দিষ্ট ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যে দোহায় অন্তত তিনটি পৃথক কার্যকরী দল গঠন করা হয়েছে।

 

এই কার্যকরী দলগুলো মূলত অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক ইস্যু, দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক জটিলতা নিরসন এবং আন্তর্জাতিক নানাবিধ নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘকাল ধরে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ জব্দকৃত তহবিল ফেরত বা ছাড়করণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

 

প্রতিটি দল নিজ নিজ ক্ষেত্রে কারিগরি ও আইনি দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে মধ্যস্থতাকারীদের কাছে তাদের বস্তুনিষ্ঠ মতামত তুলে ধরছে। এই আলোচনা প্রক্রিয়ার নেপথ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়েছে।

 

জানা গেছে, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গত মঙ্গলবার কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটি বিশেষ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমেই মূলত বর্তমান পরোক্ষ আলোচনার প্রাথমিক ভিত্তি, শর্তাবলী ও রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে, উইটকফ বা কুশনার কেউই দোহায় চলমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই কারিগরি আলোচনায় সরাসরি বা ব্যক্তিগতভাবে অংশগ্রহণ করছেন না।

 

তারা কেবল নেপথ্যে অবস্থান করে মধ্যস্থতাকারীদের সাথে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধনের জটিল কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আলোচনার ধরন ও প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্প্রতি কিছু বিভ্রান্তি ও বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছিল।

 

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এক বিবৃতিতে দাবি করেছিলেন যে, পূর্ববর্তী একটি সমঝোতা অনুসারে মঙ্গলবারেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের প্রতিনিধিরা দোহায় সরাসরি আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন। তবে ট্রাম্পের এই দাবিকে তাৎক্ষণিকভাবে এবং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় খারিজ করে দিয়েছে তেহরান প্রশাসন।

 

ইরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো অবস্থাতেই তাদের সরাসরি বা মুখোমুখি কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। যা কিছু আলোচনা বা বার্তা বিনিময় হবে, তা সম্পূর্ণভাবে কাতার ও পাকিস্তানের মতো বিশ্বস্ত তৃতীয় পক্ষের বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে।

 

পরবর্তীতে কাতার সরকারের পক্ষ থেকেও একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দোহায় বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে কোনো উচ্চপর্যায়ের বা সরাসরি বৈঠকের পরিকল্পনা নেই; পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটিই পরোক্ষভাবে এগোচ্ছে।

 

উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, মানবিক বিপর্যয় ও রক্তপাত থামাতে তেহরান এবং ওয়াশিংটন একটি যুগান্তকারী সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক সমঝোতার সূত্র ধরেই মূলত মার্কিন প্রতিনিধিরা কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেন।

 

যদিও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরকে তীব্র ভাষায় দোষারোপ করতে থাকে। এতে সমগ্র শান্তি প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যাওয়ার গভীর আশঙ্কা দেখা দিলেও, আশার কথা হলো পূর্বনির্ধারিত সমঝোতা স্মারকটি এখনও কার্যকর রয়েছে।

 

বরং সেই স্মারকের ওপর ভিত্তি করেই দুই দেশ তাদের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায় গভীরভাবে প্রত্যাশা করছে যে, দোহায় চলমান এই পরোক্ষ আলোচনা সফল হলে তা কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বরফই গলাবে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার পথও সুগম করবে।

 

- রয়টার্স