বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধ বিশ্বে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করেছে- হিল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

ইরান যুদ্ধ বিশ্বে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করেছে- হিল
ছবি : Collected

সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং পরবর্তী সমঝোতা স্মারকের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্ব ভূ-রাজনীতির সমীকরণে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক রণকৌশল ও যুদ্ধবিরতির ফলাফল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।

 

প্রখ্যাত মার্কিন দৈনিক ‘দ্য হিল’-এর এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, তেহরানের সঙ্গে এই লড়াইয়ের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে ওয়াশিংটনের প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতাকেই প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

 

ইরানি সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাতে পার্সটুডে প্রকাশিত তথ্যানুসারে, দ্য হিল-এর এই বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা মার্কিন ও পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য একটি অলাভজনক ফলাফল বয়ে এনেছে।

 

প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, এই সংঘাতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও উদ্বেগের দিক হলো-বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তিগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দৃঢ়তা ও সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সৃষ্ট সংশয়।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক সংঘাত মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউক্রেন সংকট, ভেনেজুয়েলার অস্থিরতা এবং ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মতো ঘটনাগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন প্রশাসনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক ধরণের অস্পষ্টতা ও ঘাটতি রয়েছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের মাঝেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

দ্য হিল-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমাদের বা দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। হরমুজ প্রণালি এবং তাইওয়ান প্রণালির মতো দুটি কৌশলগত নৌপথের নিরাপত্তা এখন বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

হরমুজ প্রণালি যেখানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের একটি প্রধান ধমনী, সেখানে তাইওয়ান প্রণালি এশিয়ার প্রায় ২০ শতাংশ পণ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তিবিশ্বের জন্য অপরিহার্য সেমিকন্ডাক্টর চিপ পরিবহনের প্রধান পথ।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালিতে যে ধরণের অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করানোর সক্ষমতা রাখে। একইভাবে তাইওয়ান প্রণালিতে যেকোনো ধরণের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ব প্রযুক্তি পণ্যের সরবরাহ চেইনকে ভেঙে ফেলতে পারে, যা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

 

ওয়াশিংটনের এই দুর্বলতা পর্যবেক্ষণে চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো নিজেদের কৌশলগত অবস্থানে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামরিক ধারাবাহিকতার অভাব প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোকে নতুন করে প্ররোচিত করতে পারে।

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা যদি কেবল স্বল্পমেয়াদি সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা দেখায়, তবে তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের ‘বিশ্ব পুলিশ’ বা প্রধান নীতিনির্ধারকের ভূমিকাকে ক্রমশ গৌণ করে তুলবে।

 

পরিশেষে বলা যায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের রেশ ধরে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণই বদলায়নি, বরং এটি পুরো বিশ্বের কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

 

মার্কিন সংবাদপত্রের এই বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটনকে ভবিষ্যতে তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষায় আরও দৃঢ়, সুসংগত এবং স্থিতিশীল কূটনৈতিক ও সামরিক নীতি অবলম্বন করতে হবে।

 

বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত। যদি ওয়াশিংটন এই কৌশলগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের আধিপত্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা যে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে, তা এখন বিশ্ব নেতাদের উদ্বেগের অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

- পার্সটুডে