ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে একটি বিশেষ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ টেলিফোন আলাপ সম্পন্ন করেছেন। এই আলাপের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রে জানা যায়, বিশ্ব বাণিজ্য এবং বিশেষ করে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এই ফোনালাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আলাপকালে ইরানের প্রেসিডেন্টকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের বাধা বা অচলাবস্থা যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে উভয় দেশকেই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
এই প্রণালী দিয়ে বাধাহীন নৌচলাচল কেবল ভারতের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক সরবরাহ শৃঙ্খল অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য অপরিহার্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই কূটনৈতিক ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি তার বিবৃতিতে আরও জানান যে, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান যে কূটনৈতিক আলোচনা ও বোঝাপড়ার অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, ভারত তাকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে এবং স্বাগত জানাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি অত্যন্ত গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে এই ধরনের ধারাবাহিক শান্তি প্রচেষ্টা ও গঠনমূলক আলোচনা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে একটি স্থায়ী, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এই ধরনের কূটনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদির এই বার্তাটি মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ, যেখানে ভারত তার ঐতিহাসিক মিত্র দেশগুলোর পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের সাথেও সমানতালে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে আগ্রহী।
ভারতের মতো একটি বিশাল জনসংখ্যার ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী মোদি ইরানের প্রেসিডেন্টের কাছে ভারতসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এই জলপথ, অর্থাৎ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াতের গুরুত্বটি বারবার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের দেওয়া তথ্য এবং পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই জলপথটি আক্ষরিক অর্থেই একটি লাইফলাইন বা জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে।
পরিসংখ্যান বলছে, ভারত তার অভ্যন্তরীণ চাহিদার জন্য যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করে থাকে, তার প্রায় চল্লিশ শতাংশই আসে এই হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে। শুধু তাই নয়, দেশটির মোট প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় অর্ধেক অংশই এই একই সামুদ্রিক পথ ব্যবহার করে ভারতে প্রবেশ করে।
সুতরাং, এই প্রণালীতে সামান্যতম কোনো নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বা কোনো ধরনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির মূল্যে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এর আগে থেকেই যথেষ্ট চাপের মুখে রয়েছে, তখন নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো ধরনের সংকট দেখা দিলে তা ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এ কারণেই ভারত আগাম সতর্কতা হিসেবে কূটনৈতিক মাধ্যমগুলোকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চাইছে, যাতে কোনো অবস্থাতেই হরমুজ প্রণালীর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত না ঘটে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই ফোনালাপ তারই একটি বাস্তবমুখী কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের যেকোনো ইতিবাচক বাঁক বদল যেমন আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য স্বস্তিদায়ক, তেমনি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের সাথে ভারতের এই সুসম্পর্ক এবং গঠনমূলক আলোচনা আগামী দিনে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় এক গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, নয়াদিল্লির এই কূটনৈতিক উদ্যোগ কেবল নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, বরং গোটা অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। ভারত এবং ইরানের এই দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ আগামী দিনে বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত একটি নিরাপদ এবং স্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি বিনির্মাণে সহায়ক হবে।