শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খামেনির ‘রক্তের প্রতিশোধ’ নেওয়ার অঙ্গীকার ইরানের সেনাপ্রধানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

খামেনির ‘রক্তের প্রতিশোধ’ নেওয়ার অঙ্গীকার ইরানের সেনাপ্রধানের
ছবি : File Photo

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত, ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ নেওয়ার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি।

 

রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত খামেনির ঐতিহাসিক এবং স্মরণীয় শোকানুষ্ঠানের ফাঁকে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এক নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনা, গভীর অনিশ্চয়তা ও ভয়াবহ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সমরবিদরা মেজর জেনারেল হাতামির এই হুংকারকে কেবল আবেগতাড়িত কোনো সাধারণ বিবৃতি হিসেবে দেখছেন না, বরং তারা এটিকে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে ইরানের একটি আসন্ন, সুপরিকল্পিত এবং বৃহৎ পরিসরের সরাসরি সামরিক অভিযানের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবেই মূল্যায়ন করছেন।

 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক আকস্মিক, অতর্কিত এবং অত্যন্ত বিধ্বংসী যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক ও অভাবনীয় হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণকে রাতারাতি সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে।

 

আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর থেকেই ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে, যা ইতিমধ্যেই গোটা অঞ্চলকে এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

উভয় পক্ষের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর ও চরম সীমায় পৌঁছেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের বিদায় নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

 

শুক্রবার রাজধানী তেহরানে নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। চারদিকে যখন লাখো শোকগ্রস্ত, ক্ষুব্ধ ও আবেগাপ্লুত জনতার এক বিশাল ঢল, ঠিক সেই মুহূর্তে মেজর জেনারেল আমির হাতামি গণমাধ্যমের সামনে এসে দেশের সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থান তুলে ধরেন।

 

শোকাবহ ও ভারাক্রান্ত এই পরিবেশের মধ্যেও তার কণ্ঠে ছিল চরম প্রতিশোধের এক অদম্য স্পৃহা। সামরিক পোশাকে আচ্ছাদিত জেনারেল হাতামি অত্যন্ত কঠিন, গম্ভীর ও প্রত্যয়ী ভাষায় বলেন, "আমরা পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

 

ইরানি জাতির মূল ও চিরস্থায়ী শত্রু-যুক্তরাষ্ট্র এবং অপরাধী জায়নবাদী ইসরায়েল গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে আমরা অত্যন্ত পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছি যে, আমাদের শহীদ নেতা খামেনির পবিত্র রক্তের প্রতিটি ফোঁটার চূড়ান্ত প্রতিশোধ আমরা নেবই।

 

এই কাপুরুষোচিত ও বর্বরোচিত হামলার জন্য তাদের অত্যন্ত চড়া মূল্য চোকাতে হবে এবং সেই সময় খুব বেশি দূরে নয়।" মেজর জেনারেল হাতামির এই স্পষ্ট ও জোরালো বক্তব্য থেকে এটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার যে, ইরান কেবল তাদের প্রিয় নেতা হারানোর জাতীয় শোক কাটিয়ে ওঠার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে না।

 

বরং দেশের আপামর জনতার এই শোককে এক অজেয় শক্তিতে পরিণত করে তারা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিভিন্ন কৌশলগত সামরিক স্থাপনা ও অবস্থানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বড় ধরনের, ভয়াবহ ও বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত হানার জন্য নিজেদের সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করছে।

 

উদ্ভূত এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন এক চরম, শ্বাসরুদ্ধকর ও থমথমে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই প্রকাশ্য প্রতিশোধের ঘোষণার ফলে ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, নৌবহর এবং ইসরায়েলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক নজিরবিহীন ও চরম হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা প্রতিনিয়ত সতর্ক করছেন যে, পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যেতে পারে। যদি ইরান সত্যিই একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে, তবে তা একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা করবে।

 

এমন একটি যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর এক ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব সম্প্রদায় এখন অত্যন্ত গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে এই বিস্ফোরক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। কারণ, ইরানের সামরিক বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করে দেবে সংঘাতপীড়িত মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ পরিণতি ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে যাচ্ছে।

 

- আল জাজিরা