আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অত্যন্ত উত্তেজনাকর এবং সংবেদনশীল এই মুহূর্তে একজন সন্তানের পক্ষে তার পিতার শেষ যাত্রায় উপস্থিত থাকতে না পারার এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই নতুন করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।
গত বৃহস্পতিবার ভারতে নিযুক্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার বিশেষ প্রতিনিধি আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্পর্শকাতর তথ্যটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার সুনির্দিষ্ট হুমকির কারণেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তেহরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের একেবারে প্রথম দিনেই এক অতর্কিত ও প্রলয়ঙ্কারী হামলায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
তার এই আকস্মিক মৃত্যু কেবল ইরানকেই নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিহত নেতার দাফন প্রক্রিয়া চলতি বছরের মার্চ মাসেই সম্পন্ন করার কথা ছিল।
কিন্তু শত্রুপক্ষের আগ্রাসন বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে চরম যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেই পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয় ইরানি কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক নিয়মে তার মরদেহ অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় সংরক্ষণ করার পর, সংঘাতের মাত্রা সাময়িক প্রশমিত হওয়ায় অবশেষে এই অন্তিম যাত্রার বিশাল আয়োজন করা হয়েছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুক্রবার, ৩ জুলাই থেকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, ঐতিহাসিক এই শোকযাত্রা ও আনুষঙ্গিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান টানা সাত দিন ধরে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে অনুষ্ঠিত হবে।
বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ইরানের প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে বিশ্বের শতাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, শীর্ষ কূটনীতিক এবং উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা এই জানাজায় অংশ নিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সপ্তাহব্যাপী এই সুদীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা ও শোকযাত্রা শেষে আগামী ৯ জুলাই খামেনির স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থান উত্তর-পূর্ব ইরানের অত্যন্ত পবিত্র নগরী মাশহাদে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
এদিকে, দেশের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার এই সুবিশাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি নতুন করে কোনো ধরনের সামরিক দুরভিসন্ধি, বিমান হামলা বা নাশকতার পরিকল্পনা করে, তবে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে বলে চরম ও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তেহরান।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচারিত এক বিশেষ বিবৃতিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের শীর্ষ কমান্ডার আলী আবদোল্লাহি শত্রুপক্ষকে এই কড়া সতর্কবার্তা প্রদান করেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কমান্ডার আবদোল্লাহি অত্যন্ত জোরালো ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের চিরচেনা শত্রুদের, বিশেষ করে যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার জায়নবাদী ইসরায়েল সরকারকে যেকোনো ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশ বা হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার জন্য তারা চূড়ান্তভাবে সতর্ক করছেন।
দেশের এই ঐতিহাসিক ও পবিত্র রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান চলাকালে ইরানের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র কোনো হুমকি বা সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে, তার জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যে কতটা নির্মম ও কঠোর প্রতিশোধ নেবে, সেটি তাদের অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত।
এই কঠিন বার্তার মাধ্যমে ইরান মূলত বিশ্বমঞ্চে এই বিষয়টিই স্পষ্ট করেছে যে, জাতীয় শোকের এই মুহূর্তেও তাদের সামরিক বাহিনী নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।