ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরুর বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে, গত আটই ফেব্রুয়ারি এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে সর্বশেষ জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম উত্তেজনাকর ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে তার এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশলের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তার ইঙ্গিত বহন করে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমগুলোতে বৃহস্পতিবার রাতে সম্প্রচারিত বিভিন্ন স্থিরচিত্র এবং ভিডিও দৃশ্যে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি হোসেইনিয়াহ-সংলগ্ন একটি বিশেষ শোককক্ষে রাখা আয়াতুল্লাহ খামেনির কফিনের ঠিক পাশেই অত্যন্ত ভাবগম্ভীর মুদ্রায় বসে আছেন আইআরজিসির এই শীর্ষ জেনারেল।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় পর জনসমক্ষে আসার ঠিক আগেই তিনি সাবেক সর্বোচ্চ নেতার জানাজা এবং রাষ্ট্রীয় দাফন-সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় বৈঠকেও সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক এবং সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধ-পরবর্তী যেকোনো রাজনৈতিক সমঝোতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে জেনারেল ভাহিদি বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান রূপকারের ভূমিকা পালন করছেন।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে দৃঢ়ভাবে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং তার শীর্ষ উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে নেপথ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত চিত্রগুলোতে তেহরানে খামেনির বাসভবন প্রাঙ্গণের হোসেইনিয়াহ এলাকায় আয়োজিত শোকানুষ্ঠানের এক অভূতপূর্ব, সুশৃঙ্খল ও আবেগঘন দৃশ্য ফুটে উঠেছে। সেখানে একটি সুসজ্জিত উন্মুক্ত মঞ্চে রাখা কফিনের সামনের অংশ সারিবদ্ধ লাল রঙের তাজা টিউলিপ ফুল দিয়ে নিপুণভাবে সাজানো ছিল।
একই সঙ্গে কফিনের ওপরের দিকে কাগজের তৈরি অসংখ্য সাদা রঙের প্রজাপতি ঝুলিয়ে এক অনন্য ও শোকাবহ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যা দর্শনার্থীদের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। কালো পোশাক পরিহিত অসংখ্য শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে মুখর ছিল এই সুবিশাল প্রাঙ্গণ।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বর্ণনায় উপস্থিত এই জনতাকে গত ২০২৫ সালের বারো দিনব্যাপী ভয়াবহ যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সময়ের প্রলয়ঙ্কারী ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে নিহতদের স্বজন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এই ঐতিহাসিক শোকানুষ্ঠানে উপস্থিত অনেককে পরম শ্রদ্ধা ও আবেগের বশবর্তী হয়ে কফিনের ওপর নিজেদের ওড়না এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রী নিক্ষেপ করতে দেখা যায়।
মূলত এটি শিয়া সম্প্রদায়ের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও বহুল প্রচলিত ধর্মীয় রীতি, যার মাধ্যমে পুণ্য অর্জনের পাশাপাশি প্রয়াত আধ্যাত্মিক নেতার প্রতি গভীর সম্মান ও আত্মিক সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বেশ কিছু আলোকচিত্রে দেখা যায়, আয়াতুল্লাহ খামেনির কফিনটির ওপর সাদা রঙের আরবি ক্যালিগ্রাফিতে ‘ইয়া হুসাইন’ খচিত একটি গাঢ় লাল রঙের পতাকা অত্যন্ত সযত্নে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই লাল পতাকাটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের পবিত্র কারবালা নগরীতে অবস্থিত ইমাম হুসাইনের মাজার থেকে বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদায় নিয়ে আসা হয়েছে।
শিয়া মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস, দর্শন ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই রক্তিম লাল পতাকা মূলত পবিত্র শাহাদাত বরণ, যেকোনো অন্যায় বা অবিচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং একই সঙ্গে শত্রুর বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ গ্রহণের এক শক্তিশালী ও অদম্য প্রতীক হিসেবে বিশ্বব্যাপী বিবেচিত হয়ে থাকে।
শুক্রবার সকালে তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে এক ভিন্নরকম ও অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সেখানে ইরানের সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ সদস্যরা পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় আয়াতুল্লাহ খামেনির কফিন নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হন।
এই শোকযাত্রার সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতারা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তার কফিনের পাশাপাশি সামরিক হামলায় নিহত পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কফিনের পাশ দিয়েও হেঁটে যান।
উল্লেখ্য, নিহতদের এই দীর্ঘ ও মর্মান্তিক তালিকায় খামেনির মাত্র চৌদ্দ মাস বয়সী ফুটফুটে নাতনি জাহরা মোহাম্মদি গোলপায়েগানির কফিনও স্থান পেয়েছিল, যা সেখানে উপস্থিত শোকাহত আপামর জনতার মাঝে এক হৃদয়বিদারক অনুভূতির সৃষ্টি করে এবং শোকের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী শনিবার থেকে রাজধানী তেহরানসহ গোটা দেশজুড়ে টানা কয়েক দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় জানাজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে যাচ্ছে। পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় সূচি অনুযায়ী, এরপর খামেনির মরদেহ একটি সুদীর্ঘ ও ঐতিহাসিক শোকযাত্রার মাধ্যমে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর প্রদক্ষিণ করবে এবং পরবর্তীতে ধর্মীয় আচার ও প্রার্থনা পালনের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের বেশ কয়েকটি পবিত্র শহরেও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে নিয়ে যাওয়া হবে।
দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই শোকযাত্রা ও বিশাল জনসমাগমকে কেন্দ্র করে তেহরানজুড়ে ইতোমধ্যে নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং আগত অসংখ্য বিদেশি অতিথিদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানী ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ এবং আকাশপথে বেশ কিছু বিশেষ ও সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপের যাবতীয় প্রস্তুতিও সম্পূর্ণভাবে সম্পন্ন করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।