শুক্রবার, ৩ জুলাই, এক অত্যন্ত ভাবগম্ভীর, রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক শোকানুষ্ঠানে সশরীরে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি তেহরানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানে পৌঁছানোর পর পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে অত্যন্ত উষ্ণ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানান ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে রেজা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দর মোমেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম উত্তেজনাকর এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মতো একটি প্রভাবশালী প্রতিবেশী ও পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সেনাপ্রধানের এই সফর আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক মহলে বেশ গভীর গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সেনাপ্রধানের পাশাপাশি পাকিস্তানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও বেসামরিক নেতৃত্বও এই স্মরণীয় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতাকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী মহসিন নাকভি ইতোমধ্যে তেহরানে এসে পৌঁছেছেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি মূলত মিত্র দেশ সৌদি আরবে তার পূর্বনির্ধারিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক সফর শেষ করে সেখান থেকেই সরাসরি ইরানের রাজধানীতে এসে উপস্থিত হয়েছেন।
এর আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ একটি উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দল এবং সরকারের বেশ কয়েকজন প্রথম সারির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে একদিনের এক সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সফরে তেহরানের উদ্দেশ্যে আকাশপথে যাত্রা করেন।
পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের এমন অভূতপূর্ব ও সম্মিলিত উপস্থিতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের সাথে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক বহুমুখী কূটনীতিকে ইসলামাবাদ কতটা গভীর ও আন্তরিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত নিজস্ব বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এক আকস্মিক, অতর্কিত ও ভয়াবহ যৌথ সামরিক হামলায় ছিয়াশি বছর বয়সে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তার এই আকস্মিক মৃত্যু কেবল ইরানকেই নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বাত্মক ও ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
চলমান এই যুদ্ধের তীব্রতা এবং চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণেই ইসলামি ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে তার দাফন কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় পর, বর্তমানে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে এবং ব্যাপক রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় তার চূড়ান্ত দাফন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এই জটিল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের এই ঐতিহাসিক সফর কেবল একটি ধর্মীয় বা শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক তৎপরতা।
উল্লেখ্য, চলমান এই আঞ্চলিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা প্রশমন ও একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে পর্দার অন্তরালে থেকে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সফল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জানাজা এবং দাফন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গোটা ইরানজুড়ে এক অভাবনীয়, ভাবগম্ভীর ও শোকাবহ আবহ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার থেকে তেহরানের সুবিশাল ও সুপরিচিত গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শুরু হওয়া এই আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বের শতাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়েছেন।
প্রথম দিনটি কেবল বিদেশি আমন্ত্রিত অতিথিদের রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত রাখা হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে এই লাল গোলাপ ও সাদা প্রজাপতি সজ্জিত কফিন সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে রাখা হবে।
তেহরানের এই বিশাল আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে পবিত্র শহর কোমে এবং এরপর প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের নজফ ও পবিত্র কারবালায়। দীর্ঘ এক সপ্তাহব্যাপী বিস্তৃত এই শোকযাত্রা শেষে আগামী ৯ জুলাই তার জন্মস্থান উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম অস্থিতিশীল ও ক্রান্তিলগ্নে যখন অনেক আঞ্চলিক মিত্র দেশ, বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো, নিজেদের একটি অত্যন্ত নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখছে এবং শোকানুষ্ঠানে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি, ঠিক এমন একটি সময়ে পাকিস্তানের এই শক্তিশালী ও দ্ব্যর্থহীন উপস্থিতি একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে।
একদিকে যেমন তারা তাদের প্রতিবেশী ও ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শীর্ষ নেতার প্রতি অত্যন্ত গভীর ও আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন করছে, ঠিক অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের অপরিহার্য ও শক্তিশালী অবস্থানকেও সুদৃঢ় করছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও বেসামরিক উভয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃত্বের এই যুগপৎ ইরান সফর আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন কোনো জোট বা সমীকরণের জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে, এটি চলমান সংঘাত নিরসনে এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে একটি অত্যন্ত কার্যকর ও শক্তিশালী কূটনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।