আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শোকযাত্রাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থানকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কমান্ডার আলি আবদুল্লাহ শত্রুপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের যেকোনো নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা হলে দেশের সশস্ত্র বাহিনী তার দাঁতভাঙা জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকা ও জায়নবাদী ইসরায়েল যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়ংকর।
গত আটাশে ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সূচিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামক এক বিশেষ সামরিক অভিযানের প্রথম দিনেই তেহরানে নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক নিয়মে তার মরদেহ সংরক্ষণ করার পর, আগামী রবিবার ভোর থেকে রাজধানী তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সুদীর্ঘ জানাজা প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।
এই রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য প্রভাবশালী দেশের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রনেতা, সামরিক প্রধান এবং political ব্যক্তিত্বদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সরকারি সূচি অনুযায়ী, তেহরানসহ ইরান ও ইরাকের মোট পাঁচটি ঐতিহাসিক শহরে খামেনির কফিন নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। আগামী নয়ই জুলাই তার স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থান মাশহাদ শহরে তাকে চূড়ান্তভাবে চিরনিদ্রায় শায়িত করার কথা রয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের ধারণা, সপ্তাহব্যাপী এই শোকযাত্রায় অন্তত দেড় কোটিরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটতে পারে। বিপুল সংখ্যক এই জনসমাগমকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কাকে মোটেও উড়িয়ে দিচ্ছে না তেহরানের সামরিক নীতিনির্ধারকেরা।
ফলে সমগ্র অনুষ্ঠানস্থল জুড়েই এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। চলমান এই তীব্র যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যেই আয়াতুল্লাহ খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
তবে গত ফেব্রুয়ারির সেই মার্কিন বিমান হামলায় তিনিও গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। ফলে চরম নিরাপত্তাজনিত কারণ এবং শারীরিক অসুস্থতার দরুন তিনি তার পিতার এই ঐতিহাসিক জানাজায় সশরীরে ও সরাসরি অংশ নিতে পারছেন না বলে বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মার্কিনবিরোধী অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার একটি বড় রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী।
বিশেষ করে মাশহাদ এবং কোম শহরের বিশাল গণজমায়েতকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি গভীরভাবে আলোচনায় আসছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়কাল নির্বাচন নিয়েও ব্যাপক জল্পনা-চলমান কৌশলগত বিশ্লেষণ তৈরি হয়েছে।
তেহরানে যখন আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজার মূল পর্ব শুরু হবে, ঠিক সেই সময়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির আড়াইশতম স্বাধীনতা দিবস তথা সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হতে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ওয়াশিংটনে যখন এই ঐতিহাসিক জাতীয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা চলবে, ঠিক তখনই তেহরান পাঁচ দিনব্যাপী এক সুবিশাল রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সম্পূর্ণ দৃষ্টি নিজেদের দিকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সমান্তরালে নিজেদের বিপ্লবী আদর্শ ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে প্রদর্শন করাই তেহরানের প্রধান লক্ষ্য। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই বিশাল ও ঐতিহাসিক আয়োজনকে ঘিরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এখন নানামুখী সমীকরণ ও তীব্র কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।