এই ঐতিহাসিক, শোকাবহ ও ভাবগম্ভীর আবহের মধ্যেই মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রণয়ন করছে তেহরানের নীতিনির্ধারকরা।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের উপসভাপতি হে ওয়েই-এর নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন।
এই বৈঠকে তেহরান এবং বেইজিংয়ের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত, রাজনৈতিক ও সংসদীয় সম্পর্ক আরও নিবিড় ও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর সর্বোচ্চ মাত্রায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট সম্পূর্ণ নতুন আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পরাশক্তি চীন ও ইরানের মধ্যে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের অপরিহার্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন স্পিকার কলিবফ।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় খামেনির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ রাতারাতি নতুন মোড় নিয়েছে।
উদ্ভূত এই চরম অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মাঝেই বেইজিংয়ের মতো বৈশ্বিক পরাশক্তির সঙ্গে তেহরানের এই আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বিশেষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।
স্পিকার কলিবফ চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনাকালে অত্যন্ত স্পষ্ট, সাহসী ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একটি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের বিন্দুমাত্র সামরিক হস্তক্ষেপ বা আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দেবে না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ায় ইরানের এই অনমনীয় ও আপসহীন অবস্থান গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষকরা।
এশীয় পরাশক্তির পাশাপাশি একই দিনে স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ পূর্ব ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র রাষ্ট্র বেলারুশের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ইগর সেরগেইয়েঙ্কোর সঙ্গেও এক অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও কৌশলগত বৈঠকে বসেন।
সাম্প্রতিক এই চরম সংকটময় মুহূর্তে ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রতি বেলারুশ যে অটুট, অবিচল ও অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছে, তার জন্য তিনি দেশটির সরকার ও সাধারণ জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক নীতির তীব্র সমালোচনা করে কলিবফ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং দখলদার ইসরায়েল তাদের সাম্প্রতিক এই বর্বরোচিত সামরিক আগ্রাসন ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন নিশ্চিতভাবেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা প্রত্যক্ষ আগ্রাসন কেবল চরম ব্যর্থতাই ডেকে আনবে।
এর মধ্য দিয়ে মূলত তেহরান তাদের সামরিক সক্ষমতা, জাতীয় ঐক্যের অজেয় রূপ এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতাই বিশ্ববাসীর সামনে শক্তভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। দূরপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় মিত্রদের পাশাপাশি প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারে সমান মনোযোগ ও অগ্রাধিকার দিচ্ছে বর্তমান ইরান সরকার।
এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে শুক্রবার কলিবফ ইরাকের সংসদের স্পিকার হাইবাত আল-হালবুসির সঙ্গেও এক বিশেষ ও আন্তরিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। এই দীর্ঘ আলোচনাকালে তিনি ইরান ও ইরাকের সাধারণ জনগণের মধ্যকার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও গভীর আত্মিক সম্পর্কের কথা অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন।
গত আটাশে ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের শহীদ বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঐতিহাসিক জানাজায় অংশ নিতে ইরাকি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের এই তেহরান সফরকে তিনি অত্যন্ত সম্মানের ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করেন।
পাশাপাশি, সাম্প্রতিক ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরাক সরকার ও সাধারণ জনগণ যেভাবে সব ধরনের ভেদাভেদ ভুলে ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছে, তার জন্য তিনি বাগদাদের প্রতি বিশেষ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।
পরিশেষে ইরাকের স্পিকারের সঙ্গে আলোচনাকালে মোহাম্মদ বাকের কলিবফ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়েও বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।
তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান এই ভঙ্গুর, উত্তেজনাকর ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তেহরান এবং বাগদাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বৃহৎ অর্থনীতি এবং আন্তঃসীমান্ত ট্রানজিট খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।
দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই নিবিড় ও সম্মিলিত অংশীদারিত্ব কেবল তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বহুগুণে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এই ধারাবাহিক ও বহুমুখী কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ইরান মূলত বিশ্বমঞ্চে এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চাইছে যে, চরম শোক ও যুদ্ধকালীন অভাবনীয় সংকটের মধ্যেও তারা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, কার্যকর ও দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ বলয় গড়ে তুলতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত ও সক্ষম।