শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আয়াতুল্লাহ খামেনির কফিনে সৌদি প্রতিনিধিদলের শ্রদ্ধা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম

আয়াতুল্লাহ খামেনির কফিনে সৌদি প্রতিনিধিদলের শ্রদ্ধা
ছবি: সংগৃহীত

চরম আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের মাঝেই ইরানের সদ্যপ্রয়াত সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সৌদি আরব।

 

শুক্রবার, ৩ জুলাই, রিয়াদের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদল রাজধানী তেহরানে পৌঁছে প্রয়াত এই প্রভাবশালী নেতার কফিনে নিজেদের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এল খেরেজির সুযোগ্য নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এই বিশেষ প্রতিনিধিদলটি এমন এক সময়ে ইরানে পদার্পণ করল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং সংবেদনশীল।

 

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল রিয়াদের এই তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যকার সম্পর্কের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে গোটা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থিতিশীলতা।

 

উল্লেখ্য, খামেনির এই ঐতিহাসিক জানাজা এবং বিদায় অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের অংশগ্রহণ নিয়ে এর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা এবং অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল।

 

বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল যে, রিয়াদ হয়তো তেহরানে কোনো প্রতিনিধিদল প্রেরণ করবে না এবং তারা শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তাদের অংশগ্রহণ চূড়ান্ত করেনি। তবে অতীতের সমস্ত গুঞ্জন এবং জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলটির উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, চরম বৈরিতা এবং উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের পথটি রিয়াদ একেবারে বন্ধ করে দেয়নি।

 

এই সফর প্রমাণ করে যে, বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সৌদি আরব এখনো আলোচনার দরজা খোলা রাখতে আগ্রহী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এক আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী যৌথ সামরিক হামলায় তেহরানে নিজ বাসভবনে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

 

তার এই অপ্রত্যাশিত এবং সহিংস মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধকালীন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে দাফন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা থিতু হওয়ায়, সাবেক এই সর্বোচ্চ নেতাকে চিরবিদায় জানানোর জন্য ইরান সরকার এক সপ্তাহব্যাপী সুবিশাল রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

 

শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক শোকযাত্রার সূচনা হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী, শুক্রবারের দিনটি সম্পূর্ণভাবে কেবল বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, যেখানে সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলটি অংশ নিয়েছে।

 

শনিবার সকাল থেকে সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের সুবিধার্থে তার কফিন তেহরানের একটি বিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে স্থানান্তর করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, যেখানে লাখো মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

এই সুবিশাল আয়োজনের মাধ্যমে তেহরান মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের জাতীয় ঐক্য এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করতে চাইছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের রাজনীতি ও সামরিক কৌশল নির্ধারণে খামেনির যে অসামান্য প্রভাব ছিল, তার বিদায় মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।

 

সৌদি আরবের এই শ্রদ্ধা নিবেদনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত চমকপ্রদ, কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে তীব্র টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল।

 

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের অভ্যন্তরে সরাসরি সামরিক হামলা চালায়, ঠিক তার পরপরই তেহরান অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও কঠোর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

 

পাল্টা আঘাত হিসেবে ইরান সরাসরি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো ও কৌশলগত স্বার্থ লক্ষ্য করে নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করে।

 

নিজেদের ভৌগোলিক সীমানার ভেতর দিয়ে এমন সামরিক আগ্রাসন রিয়াদ এবং অন্যান্য উপসাগরীয় মিত্রদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল, যার ফলে তেহরানের সঙ্গে তাদের যে পুনর্গঠিত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল, তাতে ব্যাপক ফাটল ও অবনতি দেখা দেয়।

 

তা সত্ত্বেও, অতীত তিক্ততা এবং বর্তমানের চরম সামরিক উত্তেজনার মাঝেও একজন প্রয়াত রাষ্ট্রনায়কের প্রতি সৌদি আরবের এই আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন আঞ্চলিক রাজনীতির এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পরিণত কূটনৈতিক চাল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

 

অন্যদিকে, এই পুরো রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সামগ্রিক নীরবতাও সমানভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। খামেনির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় শোকবার্তা বা সমবেদনা প্রকাশ করেনি, যা প্রথাগত কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কিছুটা বিপরীত।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আরব দেশগুলোর এই সম্মিলিত ও সচেতন নীরবতার পেছনে অত্যন্ত গভীর একটি রাজনৈতিক কৌশল নিহিত রয়েছে। আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তার সুযোগ্য পুত্র মোজতবা খামেনি।

 

গভীরভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে শোকবার্তা প্রেরণ বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে বৈধতা বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা থেকে নিজেদের সুকৌশলে সরিয়ে রাখছে।

 

এই জটিল রাজনৈতিক আবহের মধ্যেই সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলের তেহরান সফর মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে এক নতুন ও বহুমুখী সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে তারা যেমন প্রয়াত নেতার প্রতি সম্মান জানিয়ে শত্রুতার পারদ কিছুটা নিচে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আবার নতুন নেতৃত্বকে সরাসরি স্বীকৃতি না দিয়ে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও দরকষাকষির জায়গাটিও অত্যন্ত সুদৃঢ় রাখছে।