শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষোভে ফুঁসছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধের শঙ্কা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম

ক্ষোভে ফুঁসছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধের শঙ্কা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মর্মান্তিক ও আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের পর পুরো দেশজুড়ে এক অবর্ণনীয় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

তবে এই গভীর শোকের পাশাপাশি সাধারণ ইরানি নাগরিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ এবং প্রতিশোধের এক লেলিহান আগুন জ্বলছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত খামেনির ঐতিহাসিক জানাজা ও স্মরণ অনুষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেকোনো সময় এক ভয়ংকর ও বিধ্বংসী রূপ নিতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, লাখো মানুষের এই বিশাল গণজমায়েত থেকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চরম ও চূড়ান্ত প্রতিশোধ গ্রহণের এক জোরালো দাবি উঠতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনে এই গোটা অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় করে তুলতে পারে।

 

ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সমীকরণ ও জনমানসের এই প্রবল আলোড়ন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার কাছে এক গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন তেহরানভিত্তিক স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আব্বাস আসলানি।

 

শুক্রবার দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সতর্ক করে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার এই অন্তিম যাত্রার আনুষ্ঠানিকতা সাধারণ ইরানিদের জন্য কেবল একটি প্রথাগত ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় আচার নয়, বরং এটি এক অত্যন্ত আবেগঘন, স্পর্শকাতর ও জাতীয় ঐক্যের এক বিরল মুহূর্ত।

 

দেশবাসী যখন অশ্রুসিক্ত নয়নে ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাদের দীর্ঘদিনের পথপ্রদর্শক এবং অবিসংবাদিত নেতাকে চিরবিদায় জানাচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের অন্তরে ঘনীভূত হচ্ছে আপনজন হারানোর তীব্র বেদনা এবং একই সাথে শত্রুর প্রতি চরম ঘৃণা।

 

আসলানির সুচিন্তিত মতে, এই সুবিশাল শোক সমাবেশ ও জানাজার প্রাঙ্গণ থেকেই ওই হামলাকারী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে একটি ভয়াবহ, দ্রুত ও জোরালো প্রতিশোধ নেওয়ার প্রকাশ্য দাবি রাষ্ট্রীয় সামরিক ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের ওপর এক প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে।

 

এই স্মরণকালের সর্ববৃহৎ শোকানুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় আয়োজনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সেই স্লোগানটি হলো- ‘আমাদের জেগে উঠতে হবে’।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আব্বাস আসলানি এই ছোট অথচ শক্তিশালী স্লোগানের অন্তর্নিহিত ও গভীর অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, এটি কেবল একটি আবেগতাড়িত বা সাধারণ কোনো বাক্য নয়, বরং এটি শত্রুপক্ষ ও সমগ্র বহির্বিশ্বের প্রতি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের একটি সুস্পষ্ট, দৃঢ় এবং দ্ব্যর্থহীন রাজনৈতিক বার্তা।

 

এই শক্তিশালী বার্তার মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববাসীকে এটি নিশ্চিত করা যে, সর্বোচ্চ নেতার মতো এত বড় মাপের একজন অভিভাবক ও রাষ্ট্রনায়ককে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় নীতি, আদর্শ বা শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় বিন্দুমাত্র কোনো ফাটল ধরেনি।

 

বরং শত্রুর এই কাপুরুষোচিত আঘাত সমগ্র ইরানি জাতিকে পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ করেছে। দেশের মূল নীতিমালায় বা প্রতিরোধের দর্শনে কোনো ধরনের পরিবর্তন, পশ্চাদপসরণ বা আপসের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

 

প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘ শাসনকাল ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অসামান্য ভূমিকার কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন এই প্রবীণ ইরানি গবেষক। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, পশ্চিমা বিশ্ব এবং অন্যান্য বৈরী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে আসা ক্রমাগত অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে খামেনি ছিলেন এক অবিচল, আপসহীন ও ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব।

 

তাঁর বিচক্ষণ ও সুদক্ষ নেতৃত্বেই ইরান দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সব ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চোখরাঙানি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দেশের সামরিক বাহিনীকে একটি আধুনিক, স্বনির্ভর ও অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করা এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, কার্যকর ও সুদৃঢ় ‘প্রতিরোধব্যবস্থা’ বা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মূল রূপকার ছিলেন তিনিই।

 

আব্বাস আসলানির এই বিশদ ও গভীর মূল্যায়নের উপসংহারে এটিই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রধান ও অবিসংবাদিত চালিকাশক্তি।

 

তাঁর এই অকাল ও সহিংস প্রয়াণে যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, সাধারণ জনগণ এখন সেই গভীর শোককে এক অজেয় শক্তিতে পরিণত করে শত্রুর সরাসরি মোকাবিলা করতে চাইছে। ফলে তেহরানসহ গোটা ইরানের রাজপথে এখন কেবল স্বজন হারানোর কান্নার রোল নয়, বরং প্রতিশোধের স্লোগানও লাখো কণ্ঠে সমস্বরে উচ্চারিত হচ্ছে।

 

বিশ্ব সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল এখন চরম উৎকণ্ঠা ও গভীর উদ্বেগের সাথে ইরানের এই বিস্ফোরক পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। কারণ, শোকাহত জনতার এই জানাজা ও স্মরণ অনুষ্ঠান থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসা প্রতিশোধের ডাক যদি অচিরেই রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়, তবে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী, রক্তক্ষয়ী ও সর্বাত্মক সংঘাতের দিকে ধাবিত করবে। এমতাবস্থায় আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- আল জাজিরা