শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খামেনির বিদায়বেলায় রাষ্ট্রীয় ব্যয়বহুল আয়োজন নিয়ে ইরানিদের একাংশের তীব্র ক্ষোভ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

খামেনির বিদায়বেলায় রাষ্ট্রীয় ব্যয়বহুল আয়োজন নিয়ে ইরানিদের একাংশের তীব্র ক্ষোভ
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির চিরবিদায় উপলক্ষে দেশটিতে এক সপ্তাহব্যাপী ব্যাপক ও সুবিশাল রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বর্তমান সরকার।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের ধারণা অনুযায়ী, এই সুদীর্ঘ ও ঐতিহাসিক শোকযাত্রায় প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষের বিশাল সমাগম ঘটবে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে এই আয়োজনকে ঘিরে এক নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

 

তবে, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সাধারণ মানুষের কাছে এই বিশাল আয়োজন ও রাষ্ট্রীয় শোকের আবহের ভিন্ন একটি রূপও রয়েছে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত অর্থনীতির চরম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অনেক সাধারণ ইরানি নাগরিক এই জাঁকজমকপূর্ণ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিদায় অনুষ্ঠানের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন।

 

সপ্তাহব্যাপী হতে যাওয়া এই বিশাল রাষ্ট্রীয় আয়োজনে আগত বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে অসংখ্য অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন এবং ব্যাপক পরিসরে বিনামূল্যে খাবার বিতরণের মতো বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি, নিরবচ্ছিন্ন জরুরি ইন্টারনেট সেবা, দ্রুতগতির পরিবহন ব্যবস্থা ও ভ্রাম্যমাণ শৌচাগারের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করেছে রাষ্ট্রযন্ত্র। কিন্তু দেশের এমন এক ক্রান্তিলগ্নে, যখন সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চরম মুদ্রাস্ফীতি এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আক্ষরিক অর্থেই জর্জরিত, তখন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল অর্থ ব্যয় করে এমন বিলাসবহুল আয়োজন অনেকের কাছেই সম্পূর্ণ অর্থহীন ও চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

সাধারণ নাগরিকদের একাংশ মনে করেন, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ যদি দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হতো, তবে তা জাতির জন্য অনেক বেশি কল্যাণকর হতো।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার সঙ্গে আলাপকালে তেহরানের এমন কয়েকজন সাধারণ নাগরিক তাদের চাপা ক্ষোভ ও হতাশার কথা অত্যন্ত অকপটে তুলে ধরেছেন। আটত্রিশ বছর বয়সী পেশাদার শিল্পী কাভেহ তাদেরই একজন।

 

তিনি এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সরকারের এই বিশাল উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জীবনে চরম হতাশা ও বঞ্চনাবোধ ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনবে না। কাভেহ আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান শোকানুষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্র যেভাবে রাতারাতি তথাকথিত সুযোগ-সুবিধা, অসংখ্য অস্থায়ী তাঁবু, ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার, জরুরি ইন্টারনেট সেবা এবং অতি দ্রুতগতির সরবরাহ ব্যবস্থার পসরা সাজিয়েছে, তা অতীতে কোনোদিনই সাধারণ ইরানিদের সত্যিকার বিপদের সময় দেখা যায়নি।

 

দেশের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা অথবা প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন সাধারণ মানুষের সত্যিই এসব জরুরি সহায়তার একান্ত প্রয়োজন ছিল, তখন রাষ্ট্রীয় এই সুবিধাগুলো সাধারণ জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে।

 

কাভেহ আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাম্প্রতিক এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যখন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তীব্র লড়াইয়ে অবতীর্ণ, ঠিক সেই চরম দুঃসময়ে সাধারণ মানুষের করের অর্থে এই বিশাল ও ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।

 

তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে সরাসরি অর্থ চুরি এবং শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয় বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, একজন শাসকের বিদায়বেলায় এমন রাজকীয় আয়োজন আসলে জনগণের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর চরম উদাসীনতা ও সংবেদনশীলতার অভাবকেই বিশ্বের সামনে অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।

 

একই ধরনের গভীর হতাশা ও নির্লিপ্ততার সুর শোনা গেছে বত্রিশ বছর বয়সী পেশাদার রংমিস্ত্রি এলনাজের কণ্ঠে। তিনি আন্তর্জাতিক ওই সংবাদমাধ্যমকে তার প্রাত্যহিক জীবনের কঠিন সংগ্রামের কথা জানিয়ে বলেন, তাদের মতো সাধারণ কর্মজীবী মানুষ, যাদের জীবন চলে প্রাত্যহিক হাড়ভাঙা খাটুনির মাধ্যমে এবং যাদের সঙ্গে সরকারের বা রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতার কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই, তাদের কাছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার বেঁচে থাকা বা মৃত্যুর কোনো ব্যবহারিক পার্থক্য নেই।

 

এলনাজ অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, আয়াতুল্লাহ খামেনি যখন জীবিত ছিলেন, তখনও তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো সত্যিকারের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। আর এখন তার মৃত্যুর পরও তাদের সেই একই অর্থনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

 

তাই রাষ্ট্রের কোষাগার শূন্য করে এই যে বিশাল ও আড়ম্বরপূর্ণ বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে, তা কেন তাদের মতো খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে বিন্দুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ হবে, সেটি তার কাছে একেবারেই বোধগম্য নয়।

 

ইরানের বর্তমান এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন, ঠিক অন্যদিকে সমাজের খেটে খাওয়া ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত একটি বিশাল অংশ এই পুরো আয়োজনটিকে রাষ্ট্রের চরম অপচয় এবং সাধারণ মানুষের প্রতি এক ধরনের উপহাস হিসেবে দেখছেন।

 

আলজাজিরার এই প্রতিবেদনটি মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সাধারণ জনগণের দূরত্বের এক করুণ ও বাস্তব চিত্রই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

 

রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যকার এই বিস্তর ব্যবধান আগামী দিনে সামাজিক কাঠামোর ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বিশ্ববাসীর কাছে এক বড় প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- আল জাজিরা