শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিনের পাশে রাখা ছোট কফিনটি কার?

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিনের পাশে রাখা ছোট কফিনটি কার?
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামেনির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত বিদেশি অতিথি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা।

 

শুক্রবার ইরানের রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে এক অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও শোকাবহ পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। সুবিশাল এই প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয়েছে সাবেক এই শীর্ষ নেতার কফিন।

 

তবে সেখানে উপস্থিত সবার দৃষ্টি বিশেষভাবে নিবদ্ধ হয়েছে একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্যের দিকে। আয়াতুল্লাহ খামেনির সুবিশাল কফিনের ঠিক পাশেই সারি করে রাখা হয়েছে আরও চারটি কফিন, যার মধ্যে একটি কফিনের আকার একেবারেই ছোট, যা কোনো এক অবুঝ শিশুর।

 

সবগুলো কফিনই ইরানের জাতীয় পতাকায় সযত্নে মোড়ানো রয়েছে। এমন মর্মান্তিক ও বেদনাবিধুর দৃশ্য সেখানে উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিক এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত আটাশে ফেব্রুয়ারি এক আকস্মিক এবং অত্যন্ত বিধ্বংসী যৌথ সামরিক হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি প্রাণ হারান।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিচালিত সেই ভয়াবহ হামলায় কেবল এই প্রবীণ নেতাই নিহত হননি, বরং তার পরিবারের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনিষ্ঠ সদস্যও চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় পর যখন তার রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্ব শুরু হয়েছে, তখন সেই হামলায় নিহত পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও তার সঙ্গে সমাহিত করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

 

গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির কফিনের পাশে রাখা অন্য চারটি কফিন মূলত সেই ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারানো তার আপন পরিবারের সদস্যদের। একটি রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত কীভাবে একটি পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, এই পাঁচটি কফিনের নীরব উপস্থিতি যেন সেই চরম বাস্তবতারই এক করুণ প্রতিচ্ছবি।

 

ইরানি সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সাবেক সর্বোচ্চ নেতার কফিনের পাশে থাকা অন্যান্য মরদেহগুলোর পরিচয় ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই কফিনগুলোতে রয়েছেন তার অত্যন্ত স্নেহভাজন পরিবারের সদস্যরা।

 

তাদের মধ্যে রয়েছেন আয়াতুল্লাহ খামেনির বড় মেয়ে সৈয়দা বুশরা হোসেইনি খামেনি এবং তার স্বামী অর্থাৎ খামেনির মেয়ের জামাতা মেসবাহ উল হুদা বাঘেরি। এর পাশাপাশি রয়েছে খামেনির পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেলের নিথর মরদেহ। উল্লেখ্য, জাহরা হাদ্দাদ আদেল হলেন ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সহধর্মিণী।

 

পিতার পাশাপাশি নিজের জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার পরিবারও আজ এক অবর্ণনীয় শোকের সম্মুখীন। রাষ্ট্রীয় এই ঐতিহাসিক শোকানুষ্ঠানে একই পরিবারের এতজন সদস্যের উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে এক চরম বিষাদময় রূপ দিয়েছে।

 

তবে এই পাঁচটি কফিনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আকারের যে কফিনটি রাখা হয়েছে, সেটি அனைকেরই হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত বেদনার সাথে নিশ্চিত করেছে যে, পতাকায় মোড়ানো ওই সবচেয়ে ছোট কফিনটির ভেতরে শায়িত আছে আয়াতুল্লাহ খামেনির মাত্র চৌদ্দ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদী গোলপায়গানির মৃতদেহ।

 

জীবনের আলো ঠিকমতো দেখার আগেই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এক ভয়ংকর সংঘাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে এই নিষ্পাপ শিশুকে। বিদেশি অতিথিরা যখন একের পর এক শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এগিয়ে আসছেন, তখন এই ছোট কফিনটির সামনে এসে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন।

 

একটি অবুঝ শিশুর এমন মর্মান্তিক বিদায় যুদ্ধ এবং সংঘাতের সবচেয়ে নির্মম দিকটিকেই বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে তুলে ধরেছে। শুক্রবার কেবল বিদেশি প্রতিনিধি এবং আমন্ত্রিত অতি গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য এই শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ রাখা হলেও, শনিবার থেকে এই সুবিশাল প্রাঙ্গণ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে জানানো হয়েছে।

 

আশা করা হচ্ছে, লাখো সাধারণ ইরানি নাগরিক তাদের দীর্ঘদিনের নেতা এবং তার পরিবারের এই নির্মম মৃত্যুর খবরে শোক জানাতে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সমবেত হবেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা আন্তর্জাতিক সমীকরণ যাই হোক না কেন, তেহরানের আজকের এই চিত্র প্রমাণ করে যে, যেকোনো সংঘাতের চূড়ান্ত মূল্য চোকাতে হয় মানবতাকে।

 

খামেনির পাশাপাশি তার পরিবারের এই সদস্যদের, বিশেষ করে চৌদ্দ মাস বয়সী শিশু জাহরার এই অন্তিম যাত্রা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এক নীরব অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা রেখে যাচ্ছে।

 

- সিএনএন