এই ঐতিহাসিক, বেদনাদায়ক ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান সরকার সপ্তাহব্যাপী এক বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে দেশের আপামর জনসাধারণ থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
তবে এত বিপুল জনসমাগম এবং বর্তমান উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা এখন তেহরানের সামনে এক বিশাল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিস্তারিত বিশ্লেষণে ইরানের এই বর্তমান শঙ্কা ও প্রস্তুতির বিষয়টি গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই দাফন প্রক্রিয়া ও শোকানুষ্ঠান শুরুর ঠিক প্রাক্কালে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যেকোনো সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
শুক্রবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী দিনগুলোতে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার বা দেশকে লক্ষ্য করে যেকোনো হামলার ন্যূনতম চেষ্টা করা হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
আইআরজিসি দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছে, শত্রুদের যেকোনো ভুলের জবাব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও নির্মমভাবে দেওয়া হবে, যা তাদের লজ্জাজনক ইতিহাসে চিরকালের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
মূলত সম্প্রতি ইসরায়েলি সংবাদ সংস্থা ওয়াইনেটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পরই তেহরানের পক্ষ থেকে এমন কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনিকে তাদের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে খামেনির দাফন প্রক্রিয়াকে ঘিরে ইরান সরকার সম্ভাব্য সকল দিক থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। সপ্তাহব্যাপী এই আয়োজনে রাজধানী তেহরানে লাখ লাখ সাধারণ ইরানি নাগরিকের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অসংখ্য অতিথি উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এত বিশাল জনসমুদ্রে যেকোনো ধরনের নাশকতা বা হামলা হলে তা হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। একইসঙ্গে, এই অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে আসা ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের গুপ্তহত্যার শিকার হওয়ারও প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শুক্রবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের একটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, দাফন প্রক্রিয়া শুরুর আগেই তেহরানের প্রতিটি রাস্তায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত নিরাপত্তাকর্মীরা নিবিড় টহল দিচ্ছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে আগামী সোমবার তেহরানের আকাশসীমা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার এক নজিরবিহীন ঘোষণাও দিয়েছে ইরান সরকার।
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোউইটজ সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইরান বর্তমানে আকাশ ও স্থল-উভয় দিক থেকেই বহুমুখী হুমকির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
তার মতে, ইরানি কর্তৃপক্ষ এই মুহূর্তে সামান্যতম কোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয় এবং সে কারণেই তারা প্রতিটি স্তরে কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। তবে চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে সবার দৃষ্টি এখন মোজতবা খামেনির দিকে।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই পিতা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের হারানোর পর তিনি এই শোকানুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে উপস্থিত হবেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মতো পরাশক্তির বাইরেও ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল। দেশটির ভেতরে এমন বেশ কয়েকটি সশস্ত্র ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের সাথে অতীতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে।
এর মধ্যে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী, আরব এবং বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাসিত থাকা মুজাহিদিন-ই খালক (এমইকে) নামক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্ভাব্য নাশকতার বিষয়েও ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এই গোষ্ঠীটি গত কয়েক দশক ধরে সুযোগ পেলেই ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে আসছে। তা সত্ত্বেও, আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ভাহিদির মতো একাধিক শীর্ষ নেতাকে প্রকাশ্যেই দেখা গেছে, যা প্রমাণ করে যে ঝুঁকি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকার পরও তারা নিজেদের গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট আস্থাশীল।
এদিকে, শোকের এই আবহে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর আবেগের দৃশ্যও দেখা গেছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
শুক্রবার তেহরানে এই শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় তাদের অঝোরে কাঁদার একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা সাধারণ ইরানিদের আবেগকে আরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে এবং জাতীয় শোকের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামাদিয়ান গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, শহীদ নেতার এই বিদায় ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যেকোনো মূল্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী শনিবার সকাল ৬টায় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার দরজা সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং এর আগে কোনোভাবেই সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। তাই জনসাধারণকে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী আসার পরিকল্পনা করার জন্য তিনি বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আয়োজিত এই বিশাল ও ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে এরই মধ্যে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা এসে উপস্থিত হয়েছেন।